সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। তাকে আল্লাহ তায়ালা সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন জীবন চলার স্বাধীনতা। সে-ই স্বাধীনতার শক্তিতে কেউ চলে ভালো পথে, আবার কেউ চলে মন্দ পথে। পরীক্ষা কেন্দ্রে কক্ষ পরিদর্শক যেমন পরীক্ষার্থীকে কৃতকার্য কিংবা অকৃতকার্য উভয় দিক লেখার স্বাধীনতা দিয়ে থাকেন। তবে আল্লাহ তাঁর বান্দার সৎকাজে সাথে থাকেন, নফসের ধোঁকায় অসৎ কাজ হয়ে গেলে আল্লাহ ও বান্দার সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। সে দূরত্ব যেন তেরি না হয় সেজন্য বান্দার আত্মিক একনিষ্ঠতা একান্ত জরুরি। এ জন্যই আল্লাহ তায়ালা আমাদের সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে : ‘আমি জ্বিন ও মানবকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র এ কারণে যে, তারা আমারই ইবাদাত করবে।’ (সূরা যারিআত, আয়াত : ৫৬)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে জুরাইজ (রহ.) বলেন, মহান আল্লাহ তায়ালা জ্বিন ও মানবকে সৃষ্টি করেছেন এই কারণে যে, তারা যেন তাঁর (আল্লাহর) পরিচয় লাভ করতে পারে। (তাফসীর ইবনে কাসীর) আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে আত্মশুদ্ধির বিকল্প হতেই পারে না।
আল্লাহর মহব্বত তৈরিতে : আত্মশুদ্ধির মাধ্যমের আল্লাহর পরিচয় লাভ মানেই অন্তরে মহান প্রভুর মহব্বত সৃষ্টি হওয়া। আর মহব্বতের চিহ্ন হচ্ছে, সে আল্লাহর উপর দুনিয়া, দুনিয়াস্থিত সবকিছু এবং আপন প্রিয় বস্তুসমূহকে অগ্রাধিকার দেবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(হে নবী সা.) বলে দিন! তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছো এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছো, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা করো আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না। (সূরা তওবা, আয়াত : ২৪) সুতরাং যার কাছেই আল্লাহ ছাড়া অন্য বস্তু অধিক প্রিয় হয়, তার অন্তর অসুস্থ। এগুলো হচ্ছে আত্মার রোগের আলামত। সুতরাং আল্লাহর মহব্বত তৈরি করতে সর্বপ্রথম আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন।
নামাজে খুশুখুযু তৈরিতে : অধিকাংশ নামাজীর নামাজে খুশুখুযু থাকে না। খুশুখুযু বৈ নামাজ আল্লাহর নিকট কবুল হয় না, বরং করা হয় গায়রুল্লাহর। তা থেকে একনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনতে আত্মশুদ্ধির বিকল্প নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে ইরশাদ ফরমান, হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন। একদা আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় জনৈক ব্যক্তি আমাদের নিকট আত্মপ্রকাশ করলেন। ধবধবে সাদা তাঁর পোশাক। চুল তাঁর কুচকুচে কালো। না ছিলো তাঁর মধ্যে সফর করে আসার কোনো চিহ্ন, আর না আমাদের কেউ তাকে চিনতে পেরেছেন। তিনি এসেই নবীজি (সা.) এর নিকট বসে পড়লেন। নবীজি (সা.)-এর হাঁটুর সাথে তাঁর হাঁটু মিলিয়ে দিলেন। তাঁর দু’হাত তাঁর (নবীজি সা. এর) দুই উরুর উপর রেখে বললেন, হে মুহাম্মাদ (সা.)! ... আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। তিনি (সা.) বললেন, ইহসান হচ্ছে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেনো তুমি তাঁকে (আল্লাহকে) দেখছো। আর তুমি যদি তাকে না-ও দেখো, (তাহলে ভাবো) তিনি তোমাকে অবশ্যই দেখছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ০১, সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬৯৫)। উক্ত হাদিস অনুযায়ী যতটুকু সময় নামাজী নামাজে থাকবে ততটুকু সময় উল্লেখিত কথা ভাবা আবশ্যক। আর মানুষের ভেতরকার নফস কখনো তা হতে দেয় না। তবে তাঁরই নফস কখনো অন্যদিকে যায় না, যার আত্মা শুদ্ধ হয়েছে।
কামনা-বাসনা থেকে হিফাজত থাকতে : শারীরিক ও মানসিকভাবে যে জিনিস যতো ক্ষতিকর তার প্রতি মানুষের কামনা-বাসনা ততো বেশি। নির্ঘাত শারীরিক ক্ষতি জানার স্বত্বেও অস্বাস্থ্যকর খাবার যেমন খুব আয়েশ করে খায়, ঠিক তেমনি মানসিক অস্থিরতা ও পরকালীন জাহান্নাম নিশ্চিত জানা স্বত্বেও সেসব কাজে খাহেশ জন্মে বেশি। শারীরিক সুস্থতায় সীমাহীন কষ্ট সহ্য করে হলেও অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে যেমন বেঁচে থাকা জরুরি, ঠিক তেমনি দুনিয়াতে মানসিক শান্তি এবং পরকালীন নাজাতের জন্য অহেতুক খাহেশ থেকে বিরত থাকাও জরুরি। নতুবা ধ্বংস অনিবার্য। হাদিসে এসেছে, ‘তিনটি জিনিস মানুষকে ধ্বংস করে ছাড়ে। এক. নিজের খেয়াল-খুশির পূজারী হওয়া। দুই. লোভের দাস হওয়া। তিন. নিজেকে বড় ভেবে অহংকারী হওয়া। (তাবরানী মু’জামুল আওসাত, ৫ম খ- ৩২৮ পৃষ্ঠা, হাদিস : ৫৪৫২)
নিজেদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে ইয়াহুদী ও নাসারাগণ। ফলে দুনিয়ায় না আছে তাদের আত্মিক প্রশান্তি এবং পরকালে না আছে তাদের রেহাই। এজন্য আল্লাহ তাদের অনুসরণ ও সামঞ্জস্য করতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘আর ইয়াহুদী-নাছারারা কখনোই আপনার উপর সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবেন। আপনি বলুন, নিশ্চয় আল্লাহর দেখানো পথই সঠিক পথ। আর যদি আপনি তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করেন, আপনার নিকটে ওহী আসার পরেও, তবে আল্লাহর কবল থেকে আপনাকে বাঁচাবার মতো কোনো বন্ধু বা সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১২০)।
উক্ত আয়াতের সুক্ষ কিছু দিক আছে। যে দিক জাল দ্বারা আবৃত। সে জালে তারাই আটকে যায় যারা নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো যা দেখে তাতে আকৃষ্ট হয়, যা পায় তা-ই খায়, যা হাতে আসে তা-ই ব্যবহার করে ইত্যাদি। আর সে জাল থেকে তারাই রেহাই পায় যারা আত্মা নিয়ন্ত্রণ করে নিজেকে শুদ্ধ করে। এ সকল পরিশুদ্ধ আত্মার অধিকারীর ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘অতঃপর যে ব্যক্তি সীমালংঘন করে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দেয় জাহান্নামই হবে তার আবাস। আর যে তার প্রতিপালকের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নিজের নফসকে কামনা-বাসনা থেকে বিরত রাখে, অবশ্যই জান্নাত হবে তার ঠিকানা।’ (সূরা নাজিয়াত, আয়াত : ৩৭-৪১)
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সারওয়ার খান