সরকারিভাবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানোর পর সিলেটের বাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছ
অন্যদিকে আগামী কয়েক দিন পাইপলাইনে গ্যাসের স্বল্পচাপ থাকার ঘোষণায় নগরবাসীর মধ্যে বাড়তি গ্যাস কিনে রাখার প্রবণতাও দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ নিচ্ছেন কিছু ব্যবসায়ী।
সোমবার (২ নভেম্বর) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করে। নতুন দাম ঘোষণার পরপরই খুচরা বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ করেন ক্রেতারা।
এদিকে আগামীকাল ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাসের স্বল্পচাপ থাকবে বলে জানিয়েছেন জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল)। অনেকে এটিকে গ্যাস বন্ধ থাকবে বলে প্রচারণা করছেন। এই সুযোগটিও কাজে লাগানো পায়তাঁরা করছেন কিছু ব্যবসায়ী।
এর আগে গত ৪ অক্টোবর একই পরিমাণের সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ এক মাসেরও কম সময়ে দুই দফায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা।
সরকার নির্ধারিত নতুন দাম কার্যকরের পর বাজারে আরও বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ করছেন ক্রেতারা। তাদের দাবি, গ্যাসের স্বল্পচাপের খবরের কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কিছু বিক্রেতা এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছেন।
নগররীর আম্বরখানা এলাকার টং দোকানদার তায়েফ আহমেদ বলেন, ‘১ হাজার ৮৩৭ টাকা সরকারি মূল্যের পরিবর্তে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতাম। গতকাল সরকার ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণের ঘোষণা দিতেই ২ হাজার ১৫০ টাকা দিয়ে গ্যাস কিনেছি।’
তিনি বলেন, ‘এমনিতেই সব কিছুর দাম বাড়তি। এর মধ্যে যে হারে গ্যাসের দাম বাড়ছে ব্যবসা করে পরিবার চালানো দিনদিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’
শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই নন, বাসাবাড়িতে ব্যবহার করা এলপিজি সিলিন্ডার কিনতেও বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে নগরবাসীকে। নগরের মদিনা মার্কেট এলাকার বাসিন্দা সুমন মালাকার বলেন, ‘২ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনেছি, তাও আবার দোকানিকে অগ্রিম টাকা দিতে হয়েছে। আগে কিছুটা সহনীয় থাকলেও সরকার কর্তৃক গ্যাসের দাম বাড়ানো এবং গ্যাসের চাপ কম থাকার সুযোগে ব্যবসায়ীরা গ্যাসের দাম বেশি চাচ্ছেন। এতে বাধ্য হয়েই বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে জরুরি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দাম বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।’
এদিকে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এলএনজি টার্মিনালের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্য আগামী ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এ সময় জেজিটিডিএসএলের আওতাধীন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করবে। ফলে আবাসিক, বাণিজ্যিকসহ সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাস ব্যবহারে সমস্যায় পড়তে পারেন।
এ বিষয়ে সিলেট মহানগর এলপিজি রিটেইলার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সরোয়ার উদ্দিন ভূইয়া জানান, দোকান থেকে সরাসরি সিলিন্ডার কিনলে সরকার নির্ধারিত ২ হাজার ৬০ টাকা নেওয়া যায়। তবে তারা যেসব সিলিন্ডার কিনে আনছেন, সেগুলো ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করছেন। চার বা পাঁচতলায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নেওয়া হচ্ছে ২ হাজার ১৫০ টাকা। ডিলার পর্যায়ে দাম কমলে বা বাড়লে বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
তিনি বলেন, ‘বাজারে বর্তমানে গ্যাসের কিছুটা সংকট রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ পাচ্ছেন না। আগে ডিলারদের গাড়ি নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে গ্যাস সরবরাহ করত। এখন সরবরাহের ঘাটতির কারণে অনেক ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন জায়গা থেকে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত খরচের কারণে কিছু জায়গায় দাম বেশি পড়তে পারে। তবে দোকান থেকে ২০৬০ টাকার ওপরে বিক্রি করার কথা নয়।’
সরোয়ার উদ্দিন ভূইয়া আরও বলেন, ‘আমি সকালে ব্যবসায়ীদের বলে দিয়েছি, ২ হাজার ৬০ টাকার বেশি নিলে অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জের বিষয়টি মেমোতে উল্লেখ করতে হবে। এতে ক্রেতারা বুঝতে পারবেন, সিলিন্ডারের নির্ধারিত দামের বাইরে কত টাকা ডেলিভারি চার্জ নেওয়া হচ্ছে। কেউ ৫০ বা ১০০ টাকা ডেলিভারি চার্জ নিলে সেটিও মেমোতে উল্লেখ করতে হবে।’
বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কোনো কোম্পানি ২ হাজার ১৯০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দামে ডিলারদের কাছে গ্যাস বিক্রি করছে। কেউ যদি বেশি দামে কেনার যৌক্তিক প্রমাণ দেখাতে পারেন, তাহলে সেটি বিবেচনা করতে হবে। আর প্রমাণ দেখাতে না পারলে আমরা বিকল্প সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যলয়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আয়েশা আক্তার বলেন, ‘ নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। অতিরিক্ত দামের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ মোঃ সারওয়ার খান