বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নগরবাসী ডেঙ্গুর আতঙ্ক আর মশার অসহনীয় যন্ত্রণায় দিন কাটিয়েছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয় ও একের পর এক কর্মসূচি নেওয়া হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়; এটি সারা বছরের নগর সংকটে পরিণত হয়েছে। অব্যবস্থাপনা, সমন্বয়ের ঘাটতি ও দায়সারা কার্যক্রম চলতে থাকলে চলতি বছরেও একই ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে।
গত বছরের শুরুতেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকে। বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেয়। রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হয়, অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়। একই সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ে।
নগরবাসীর অভিযোগ, সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যক্রম ছিল মূলত লোক দেখানো। নিয়মিত ওষুধ ছিটালেও মশার সংখ্যা কমেনি। বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এমনকি সরকারি দপ্তর এলাকাতেও মশার দাপট স্পষ্ট। দিনের বেলাতেও কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন মানুষ, যা নতুন করে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে জরুরি লার্ভা ধ্বংস ও মশার উৎসস্থল শনাক্ত করা। কিন্তু সেই জায়গায় কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ছাদ ও নির্মাণস্থলে জমে থাকা পানি, অব্যবহৃত টব-ড্রাম এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন একই ধরনের ওষুধ ব্যবহারে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। বিকল্প ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
মশা নিয়ন্ত্রণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ১৫৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ১১০ কোটি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৪৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। গত এক দশকে মশা নিধনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৩০ কোটি টাকা।
এ সময়ে ড্রোন ব্যবহার, পরিত্যক্ত দ্রব্যাদি কিনে নেওয়া, জলাশয়ে ব্যাঙ ছাড়া—এমন নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফল আসেনি। ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক অস্থিরতায় সিটি করপোরেশনের সেবা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হয়। মেয়র-কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালনা চললেও নগর সেবায় গতি ফেরেনি।
কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বছরজুড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, মাঠপর্যায়ের কঠোর নজরদারি, জনসচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।