• বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৯ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
কুলাউড়ায় বিএনপিতে যোগ দিলেন প্রবাসী আওয়ামীলীগ নেতা সাইফুল আলম সিদ্দিকী পল্টন ট্র্যাজেডি দিবসে কুলাউড়ায় জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ সরতেই হচ্ছে পুলিশ প্রধানকে ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপি অসতর্কভাবে শব্দচয়ন করেছেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিলেটে বেড়েছে মশার উপদ্রব, ফগার মেশিন হাতে মশক নিধনে সিসিক প্রশাসক সিলেটে ছাত্রলীগের মিছিল প্রস্তুতি, আ ট ক ২ আইজিপির দায়িত্ব থেকে অতি দ্রুত সরে যাওয়া উচিত: নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী টস জিতে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, একাদশে নেই মুশফিক রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর আজ, লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত হন ১৩ জন ফায়ার সার্ভিসকে বিশ্বমানের করতে হবে : বাণিজ্যমন্ত্রী বড়লেখায় মাত্র ৯০ টাকার জন্য প্রাণ গেল দর্জির প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে প্রেসক্লাব বিলুপ্ত করা যাবে না নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না পুলিশ: আইজিপি জামিন মেলেনি আখতারুজ্জামানের সিলেটে তরুণ-তরুণীর ছবি ছড়িয়ে ধর্মীয় পরিচয়ে হেনস্তা, মেহমান রেস্টুরেন্টের দুই কর্মী গ্রেপ্তার সাড়ে ৩৪ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ ট্রাকচালক হোসেন হত্যায় হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরু শাদাবের সেঞ্চুরিতে পাকিস্তানের অবিশ্বাস্য জয়, শেষ জুটিতে রেকর্ড

বরগুনায় ভোটের লড়াই এমনও হতে পারে, বুকে একজনের প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে আরেকজনকে ভোট দিয়ে আসবে

Reporter Name / ১৮৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

294

পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে শাখারিয়া হয়ে আমতলী, বরগুনা সদর পেরিয়ে পাথরঘাটায় পৌঁছাই আমরা। বলেশ্বর নদের একেবারে শেষ প্রান্তে, বাগেরহাটের শরণখোলা সীমান্তঘেঁষা এই পাথরঘাটা বরগুনার অন্যতম প্রত্যন্ত এলাকা। ২০০৭ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরে এখানে প্রাণ হারান ৬৩ জন মানুষ।

দীর্ঘ এই যাত্রাপথে গলাচিপা নদী, পায়রা নদী ও বিশখালী নদী পার হতে হয়েছে ট্রলারে। প্রায় ৭০ কিলোমিটারের পথ। এই পথ পাড়ি দিতে দিতে বরগুনার দুটি সংসদীয় আসনের নির্বাচনী হালচাল বোঝার চেষ্টা করেছি। পথে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় ভোটের পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। অন্তত ২৭ জনের সঙ্গে কথা বলে সংসদ সদস্যের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা ও অতীত অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি।

নদী ও সমুদ্র ঘেরা বরগুনা জেলার বড় একটি অংশের মানুষের জীবিকা মৎস্যনির্ভর। উপকূলীয় এই জেলার চারটি উপজেলায় যেতে এখনো নদীপথের কোনো বিকল্প নেই। বরিশাল যেতে হলেও সরু ও ভাঙাচোরা রাস্তা পাড়ি দিতে হয়। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী। অনেক এলাকায় এখনো সুপেয় পানির সংকট প্রকট। তবু পর্যটনের বিকাশসহ সম্ভাবনাও কম নয়। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, পরিকল্পনার অভাব ও তদারকির ঘাটতিতে সরকার বদলালেও মানুষের জীবনমান বদলায়নি।বরগুনার দুটি আসনে বরাবরই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। বেশির ভাগ সময়ই জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। তবে এবারের বাস্তবতা ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটের সমীকরণ বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়েছে। এবার বিএনপির ধানের শীষের বিপরীতে এক আসনে জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা, অন্য আসনে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীদের চাঁদাবাজি, দখলদারিসহ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলছে। দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল দুই আসনেই বিএনপির প্রার্থীদের অস্বস্তিতে ফেলেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে জনসভাতেও দলের এক পক্ষ আরেক পক্ষের নেতাদের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করছে।

এসব কারণে জেলার রাজনীতির চেনা সমীকরণ ভেঙে পড়েছে। অনেক ভোটারের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কা। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে এক দলের প্রচারে গেলেও ভোট দেবেন অন্য দলে—এমন কথাও জানিয়েছেন। ফলে বরগুনার দুটি আসনেই জাতীয় নির্বাচনের অতীতের চেনা হিসাব বদলে যেতে পারে।বরগুনা-১ আসনে সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা অন্তর্ভুক্ত। এখানে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৯ হাজার ৪৬০ জন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিবারই আওয়ামী লীগ অথবা তাদের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এর মধ্যে ২০০১ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।

বেতাগী, বামনা ও পাথরঘাটা উপজেলা নিয়ে গঠিত বরগুনা-২ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪৪ জন। ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে এখানে ইসলামী ঐক্যজোট এবং ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হন। এরপর প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতেছেন। তবে আওয়ামী লীগ আমলে দলটির অনেক সমর্থকই ভোট দিতে যাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বড় নেতাদের প্রতি ক্ষোভের কথাও উঠে এসেছে তাঁদের বক্তব্যে।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বরগুনা জেলা শাখার সভাপতি ও পাথরঘাটার সৈয়দ ফজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ মো. জিয়াউল করিম বলেন, আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট দেওয়া না দেওয়া বা অন্য দলে ঝুঁকে পড়া—দুই ধরনের প্রতিক্রিয়াই দেখা যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ আছে, আবার ভয়ও আছে। তিনি বলেন, ‘এমনও হতে পারে, বুকের মধ্যে একজনের প্ল্যাকার্ড লাগিয়ে গিয়ে হয়তো অন্য কাউকে ভোট দিয়ে আসবে। মানুষ বলে কী আর করে কী—বোঝা কঠিন।’বরগুনা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম মোল্লা, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুল হাসান অলিউল্লাহ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সমর্থিত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন (দেয়ালঘড়ি মার্কা)। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, মাঠের বাস্তবতায় এই আসনে মূল লড়াই ধানের শীষ ও হাতপাখার মধ্যে। বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থানের পাশাপাশি কেওড়াবুনিয়া দরবারের পীর হিসেবে মাহমুদুল হাসানের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও বড় ফ্যাক্টর। বরগুনা সদরের পুরাকাটায় ঢুকতেই হাতপাখার ব্যানার ও মাইকিং চোখে পড়ে। তবে ব্যানারে প্রার্থীর ছবি নেই। বিএনপির প্রচারও ছিল চোখে পড়ার মতো। ১১-দলীয় জোটের প্রচার তুলনামূলক কম।

আগের নির্বাচনের ভোটের হিসাবও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দেয়। ২০০১ সালে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী পান ১১ হাজার ৮৮৯ ভোট, বিএনপি জোটের প্রার্থী পান ১ হাজার ৩৭৬ ভোট। ২০০৮ সালে হাতপাখার ২১ হাজার ৩৮৪ ভোটের বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী পান ২৪ হাজার ৬৮৬ ভোট। ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে হাতপাখা পায় ১৪ হাজার ৪১৯ ভোট এবং বিএনপি প্রার্থী পায় ১৫ হাজার ৩৪৪ ভোট।

বরগুনা-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম মণি, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুলতান আহমদ এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মিজানুর রহমান কাসেমী। স্থানীয় বাসিন্দাদের ধারণা, এখানে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে শক্ত লড়াই হবে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং জামায়াতের সাংগঠনিক শক্তি এই আসনের হিসাব বদলে দিতে পারে। একটি সূত্র জানায়, যেকোনো মূল্যে এই আসন জিততে চায় জামায়াত এবং পুরো জেলা শক্তি এখানে নিয়োজিত।

পাথরঘাটা পৌরসভার লিকার পট্টিতে কথা হয় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীর সঙ্গে। তাঁদের একজন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মার খাইলাম, জেলে গেলাম আমরা—আর হে এখন নাচে হাইব্রিডগো লইয়া।’ এতে স্থানীয় বিএনপির ভেতরের ক্ষোভ স্পষ্ট। পাথরঘাটায় দলীয় কোন্দলে নূরুল ইসলাম মণি যে অস্বস্তিতে আছেন, তা তাঁর বক্তব্যেও উঠে এসেছে। ২৭ জানুয়ারি খলিফার হাটে জনসভায় তিনি বলেন, ‘আমি যত দিন এমপি ছিলাম, চাঁদাবাজি করায় পাথরঘাটা উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি তত দিন জেলে ছিল।’

এই বক্তব্য ঘিরে সমালোচনাও চলছে। লিকার পট্টিতেই পাওয়া গেল পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল হাসানকে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সময় আমার বিরুদ্ধে ৩৬টা মামলা হয়েছে। এখন আমি রাজনীতি করতে পারছি না।’

বলেশ্বর নদের তীরে পদ্মা স্লুইস এলাকায় গিয়ে দেখা গেল ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ জেলে। ভোটের কোনো আমেজ নেই। জেলে বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘নদীতে যাই, মাছ পাইলে খাই। কোনো সরকারই আমাদের পাশে দাঁড়ায় নাই।’ আরেক জেলে আবদুল আউয়াল বলেন, ‘একটা নির্বাচন দরকার। মারামারি না হলে মানুষ ভোট দিতে যাবে।’

২০০৭ সালের সিডরের পর ‘পদ্মা ভাঙল’ নামে পরিচিত এলাকায় নদীভাঙনে জনপদ বিলীন হয়েছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। জেলে মজিবুর রহমান বলেন, ‘এলাকার একমাত্র রিজার্ভ পুকুরটাও ভেঙে গেছে।’ আলমগীর হোসেন (কালু মাঝি) বলেন, ‘ভোট দিলে জীবন বদলাবে কি না জানি না। সবাই পেটের ধান্দায়।’

ভোটের ভয়, নীরবতা আর ব্যক্তিগত হিসাবের মধ্যেই চলছে বরগুনার মানুষের ভোটের চিন্তা। ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখার শক্ত লড়াইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উপকূলের মানুষ এখনো প্রশ্ন রাখছেন—ভোট দিলে কি সত্যিই বদলাবে নদীভাঙন, ক্ষুধা আর সুপেয় পানির কষ্টে কাটানো জীবন?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd