আর কিছুক্ষণ পর ভারতের আহমেদাবাদে রমরমা ব্লকবাস্টার গ্র্যান্ড ফাইনাল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দশম আসরের ফাইনালে কো-হোস্ট ভারতের সামনে নিউজিল্যান্ড। এই টুর্নামেন্টে কখনোই কিউইদের হারাতে পারেনি ভারত। এবার কি বদলাবে ইতিহাস? নাকি আরো একবার সাইলেন্ট হয়ে যাবে আহমেদাবাদ। খেলা শুরু বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়। লড়াইটা হবে দাপুটের বিরুদ্ধে মিতব্যয়ী লড়াইয়ের।
সন্ধ্যার পর ক্রিকেট বিশ্বের চোখ আটকে থাকবে আহমেদাবাদের মেগা ফাইনালে। ১১ বছরে এটি ভারতের পঞ্চম সাদা বলের আইসিসি ফাইনাল। মজার ব্যাপার হলো, তাদের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের পরিসংখ্যানও ঠিক একই। তবে এই দুই দলের সাফল্যের পেছনের গল্প এবং পথচলা আকাশ-পাতাল ভিন্ন। একদিকে ভারতের অফুরন্ত প্রতিভার ভাণ্ডার, অন্যদিকে নিউজিল্যান্ডের সীমিত সম্পদ আর অদম্য জেদ।
ভারতীয় ক্রিকেটে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। গ্লেন ফিলিপস যথার্থই বলেছেন, ভারত চাইলে এমন তিনটি আলাদা দল নামাতে পারত যারা প্রত্যেকেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলার যোগ্যতা রাখে। ভারতের এই শক্তির মূলে রয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জোয়ার।

তামিলনাড়ু প্রিমিয়ার লিগ থেকে উঠে আসা বরুণ চক্রবর্তী কিংবা মুম্বাই টি-টোয়েন্টি লিগের শিবম দুবে—তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণে ভারত এখন বিশ্বের অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এমনকি গুজরাট টাইটানসের বর্তমান অধিনায়কও (শুভমান গিল) ভারতের টি-টোয়েন্টি পরিকল্পনায় এখন ‘উদ্বৃত্ত’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, যা ভারতের গভীরতা প্রমাণ করে।
নিউজিল্যান্ডের চ্যালেঞ্জগুলো একেবারেই ভিন্ন। কনকনে শীত আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝেও তারা কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে ইনডোর পিচ তৈরি করে অনুশীলন চালিয়ে যায়। নিউজিল্যান্ডে রাগবি হলো নেশা আর ক্রিকেট হলো ভালোবাসা। কেন উইলিয়ামসন নিজেই স্বীকার করেছেন, তারা সবাই ছোটবেলায় অল ব্ল্যাকস (রাগবি দল) হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা না পেরে ক্রিকেটে এসেছেন।

নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটাররা শুধু এক খেলার ওপর নির্ভরশীল নন। ড্যারিল মিচেলের বাবা ছিলেন অল ব্ল্যাকসের কোচ, ফলে মানসিক দৃঢ়তা রক্তে। গ্লেন ফিলিপসের ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন একজন স্প্রিন্টার, যা হয়তো তার ক্ষিপ্রগতির রহস্য। কিউইরা মনে করে, আগে একজন ভালো অ্যাথলেট হওয়া জরুরি, তারপর ক্রিকেটার। এই বহুমুখী ক্রীড়া চর্চাই তাদের সীমিত জনসংখ্যা সত্ত্বেও বিশ্বমঞ্চে টিকে থাকতে সাহায্য করে।
ভারত যেখানে আইপিএলকে সুরক্ষিত রাখতে তাদের খেলোয়াড়দের বাইরের লিগে খেলতে দেয় না, নিউজিল্যান্ড সেখানে উদার। ফিন অ্যালেন, ডভন কনওয়ে কিংবা লকি ফার্গুসনরা সারা বিশ্বের বিভিন্ন লিগে খেলে নিজেদের শাণিত করেছেন। এমনকি ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ও স্টিফেন ফ্লেমিংদের পরামর্শে নিউজিল্যান্ডে এখন ‘এনজেড-২০’ নামে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ শুরুর তোড়জোড় চলছে।

ভারত এই ফাইনালে পৌঁছেছে ১৫ ম্যাচে ১৪টি জয় নিয়ে। তারা চায় প্রথম স্বাগতিক দেশ হিসেবে ট্রফি জিততে এবং প্রথম দল হিসেবে শিরোপা রক্ষা করতে। ভারতের হাতে এত বিকল্প যে, তারা চাইলেই আইপিএলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহককে টপ অর্ডারে ডেকে নিতে পারে কিংবা প্রয়োজনে এক নম্বর টি-টোয়েন্টি বোলারকেও পরিবর্তন করার সাহস রাখে।
অন্যদিকে, নিউজিল্যান্ডের অবস্থা এমন যে, ইনজুরি কাভার হিসেবে তারা দুই বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট না খেলা কোল ম্যাককনচিকে উড়িয়ে এনে সরাসরি একাদশে নামিয়ে দেয়। কিন্তু দিনশেষে সঞ্জু স্যামসন বা কুলদীপ যাদবের মতো ম্যাককনচির গলায়ও বিশ্বজয়ের মেডেল ওঠার সমান সম্ভাবনা রয়েছে।
এই বৈপরীত্যই ভারত ও নিউজিল্যান্ডের লড়াইকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একদিকে বিশাল জনসংখ্যা ও অর্থের ঝনঝনানি, অন্যদিকে ছোট দেশের বড় স্বপ্ন, রোববার আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে এক মহাকাব্যিক লড়াইয়ের অপেক্ষায় ক্রিকেট বিশ্ব।












