সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে প্রথা ভাঙলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। সাংবাদিকদের প্রশ্ন করা থামিয়ে দিলেন। সাংবাদিক কর্মীদের নিজেই প্রশ্ন করলেন। জানতে চাইলেন এ সফরে তার কাছ থেকে কী আশা করেন সবাই! দুই-একজনের কাছে উত্তরও পেলেন, এর মধ্যে এক সংবাদকর্মী জানালেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেছেন, সম্মান নিয়ে ফেরাই এই সফরের সফলতা হবে! শান্তর এ উত্তর পছন্দ হয়েছে, তাতে তিনি সায় দিয়ে মাথাও ঝাঁকালেন। দীর্ঘ ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
বহুল কাঙ্ক্ষিত এই সফরে আজ ও আগামীকাল দুই ধাপে দেশ ছাড়ছে টাইগাররা। গতকাল মিরপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মুখোমুখি হয়ে অধিনায়ক জানালেন দীর্ঘকাল পর অজিদের মাটিতে এ টেস্ট সিরিজ নিয়ে যেমন রয়েছে রোমাঞ্চ, তেমনই আছে পর্বতসম প্রত্যাশার চাপ। সব চাপকে কাটিয়ে ইতিবাচক ক্রিকেট খেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। শান্ত বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে কীভাবে আমরা ওখানে ভালো ক্রিকেট খেলে সম্মান অর্জন করতে পারি। ওখানে যদি আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে পারি, অবশ্যই তারা আবার ভবিষ্যতে খেলার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানাবে।’
কন্ডিশনগত চ্যালেঞ্জ সামলে এই সিরিজে অজিদের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এখন পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছে টাইগাররা। অধিনায়কের মতে, এই সফর ক্রিকেটের অগ্রগতিতে দারুণ ভূমিকা রাখবে। অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে প্রায় দুই যুগ পর খেলতে যাওয়ার আনন্দ পুরো স্কোয়াডকেই রোমাঞ্চিত করছে। বিশেষ করে দীর্ঘ ২০ বছর ও ১০০টিরও বেশি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা থাকার পরও তারকা ব্যাটার মুশফিকুর রহীম কখনো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সাদা পোশাকে খেলার সুযোগ পাননি। সিনিয়রদের এই আক্ষেপ মোচনের পাশাপাশি পেস বোলিং আক্রমণের ওপর আস্থা রাখছেন নাজমুল। তাসকিন, ইবাদত ও হাসান মাহমুদদের সমন্বয়ে গঠিত পেস আক্রমণ প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট তুলে নিতে সক্ষম বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পেস বোলাররা অত্যন্ত সক্ষম। তারা যদি তাদের সেরা বোলিংটা উপহার দিতে পারে, তবে অবশ্যই ২০টি উইকেট নেয়া সম্ভব। বর্তমান দলের ওপর আমার শতভাগ বিশ্বাস আছে যে আমরা অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে দারুণ ক্রিকেট উপহার দিতে সম্পূর্ণ সক্ষম হবো।’ এই সফরের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ইনজুরি। নাহিদ রানা, শরিফুল ইসলাম বা লিটন দাস নেই প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে। তাদের অভাব থাকলেও তাদের ছাড়া দল দুর্বল এমনটা মানতে নারাজ শান্ত। তিনি বলেন, ‘নাহিদ রানা, শরিফুল বা লিটন দাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তবে যারা সুযোগ পেয়েছে তাদের ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে।
অধিনায়ক হিসেবে সবসময় সেরা খেলোয়াড়দের পাবো- এটা আশা করা একেবারেই ঠিক নয়।’ কন্ডিশনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে দেশে প্রথাগত গ্রানাইটের ওপর বোলিং মেশিনে কঠোর অনুশীলন চালায় দল। অজিদের বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের সামনে ব্যাটারদের জন্য কাজটা একেবারেই সহজ হবে না। বিশেষ করে চারজন বাঁহাতি ব্যাটার থাকা এবং বাউন্সি উইকেটের গতি সামলানো নিয়ে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। বাউন্সি উইকেটে সৌম্য সরকারের সামর্থ্য ও সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাকে ইতিবাচক দিক হিসেবে চিহ্নিত করেন শান্ত। প্রতিপক্ষের বিশ্বসেরা পেসারদের মুখোমুখি হওয়াকে ভীতির চোখে না দেখে রোমাঞ্চকর সুযোগ হিসেবে নিচ্ছেন টাইগার অধিনায়ক। ব্যাটিং ইউনিটের প্রস্তুতি ও মানসিকতা প্রসঙ্গে অজিদের শক্ত বোলিং লাইনআপ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা একটা বড় সুযোগ এমন বিশ্বমানের বোলিংয়ের বিপক্ষে ভালো করার। আমাদের ব্যাটসম্যানরা খুব উদগ্রীব চ্যালেঞ্জটা নেয়ার জন্য।’ বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে দেশের ক্রিকেট সমর্থকদের প্রত্যাশার পারদ এখন তুঙ্গে। প্রতিপক্ষের মাঠে গিয়ে অজিদের পূর্ণ শক্তির দলের মুখোমুখি হওয়াটা দলটির অর্জিত সম্মানেরই বহিঃপ্রকাশ।
দুই দশক আগের প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান পরিস্থিতির বেশ তফাত রয়েছে। দর্শকরা এখন শুধু অংশ নেওয়ায় সন্তুষ্ট নয়, তারা চান জয়ের লড়াই। সমর্থকদের এই বাড়তি চাপকে একটি পজিটিভ মনে করেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘আমাদের দর্শকেরা প্রতিটা সিরিজে অনেক প্রত্যাশা করে। তারা আশা করে আমরা প্রতিটা ম্যাচ জিতব, এটা একটা ইতিবাচক দিক।’ এই সফরের আগে অস্ট্রেলিয়া নিজেদের শক্তিশালী দল ঘোষণা করেছে। কারণ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে বাংলাদেশকে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি নয় অজিরা। অন্যদিকে দল ঘোষণার আগে টাইগার নির্বাচকদের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইনজুরি। এ নিয়ে শান্ত বলেন, ‘ইনজুরির বিষয়টা আসলে আমাদের কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। যেকোনো সময় যেকোনো খেলোয়াড় ইনজুরড হতে পারে। তবে আমার মনে হয় যে দলটা আমাদের অস্ট্রেলিয়াতে যাচ্ছে, এই দলের ওপর পুরোপুরি বিশ্বাস আছে যে আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারব। কোনো খেলোয়াড় থাকলে ভালো হতো বা আরও বেটার হতো্তএগুলো নিয়ে চিন্তা করাটা এখন যৌক্তিক হবে না। কতো ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি এই দলটা নিয়ে এবং দলের ওপর কতোটুকু বিশ্বাস রাখতে পারি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ, যা আমার আছে।’