• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ১০:০০ পূর্বাহ্ন
ব্রেকিং নিউজ
পরাশক্তির শক্তি বনাম দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র – ইরান সংঘাতের নতুন পাঠ জুমার আজানের পর যে কাজগুলো করা নিষেধ অস্ট্রেলিয়ায় শান্তর ‘মিশন রেসপেক্ট’ প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে রাতের নগর ব্যবস্থাপনা যাচাই করলেন প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে নাজেহাল পলাতক আ.লীগ নেতা রেজাউল, পালিয়ে যান হাছান মাহমুদ ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াঁজো কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত প্রতিবন্ধী ৩ ব্যক্তির হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিলেন প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় নির্বাচনে স/ন্ত্রা/স দিয়ে ভোট দ*খ*লের চেষ্টা হবে: নাহিদ ইসলাম শহীদ তুরাব স্মরণে জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন এর বৃক্ষরোপণ বালাগঞ্জে নির্মাণাধীন স্কুল ভবন নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ কুলাউড়ায় সরকারি বীজসহ বিক্রেতা আটক, ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড সিলেটে রাস্তা পারাপারের সময় অটোরিকশার ধাক্কায় স্কুলশিক্ষকের মৃত্যু হাম উপসর্গে আরো ৪ মৃত্যু, আক্রান্ত ১০০৫ জুলাইযোদ্ধাদের সঙ্গে বেইমানি করলে আল্লাহ আমাদের ছেড়ে দেবেন না- ডা. শফিকুর রহমান গাজায় ২০২৩ সালের পর এতিম হয়েছে ৬০ হাজারেরও বেশি শিশু পুলিশও হবেন, দলীয় এজেন্ডাও বাস্তবায়ন করবেন—এটা হতে পারে না, বললেন হাসনাত হবিগঞ্জ ছাত্রদলের সভাপতিসহ শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে এনসিপির মামলা মিরাজ বাদ, সাদা বলের দুই ফরম্যাটের অধিনায়ক লিটন ওসমানীনগরে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে শঙ্কা, রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা ৫ দিন ভারি বর্ষণ হতে পারে

পরাশক্তির শক্তি বনাম দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র – ইরান সংঘাতের নতুন পাঠ

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

8

আজকের বিশ্বে যুদ্ধের ফলাফল কেবল বোমার বিস্ফোরণ, ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা কিংবা আকাশে যুদ্ধবিমানের আধিপত্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। প্রকৃত বিজয়ী সে-ই, যে যুদ্ধের পর নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করে, অর্থনৈতিক স্থিতি ধরে রাখে, কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ায় এবং প্রতিপক্ষকে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাতকে বিশ্লেষণ করলে একটি অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসে- সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব আর কৌশলগত সাফল্য এক বিষয় নয়। ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ইরাকের অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, একটি পরাশক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েও রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হতে পারে। কারণ যুদ্ধের চূড়ান্ত বিচার হয় কূটনৈতিক টেবিলে, যুদ্ধক্ষেত্রের ধ্বংসস্তূপে নয়।

 

ফলে আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আর “কার অস্ত্র বেশি শক্তিশালী?” নয়; বরং “কার কৌশল দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ?” মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে। ওয়াশিংটন বারবার সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক সমাধানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা ধ্বংস করা যায় না। বোমা দিয়ে সরকার দুর্বল করা যায়, কিন্তু সামাজিক বৈধতা, আদর্শিক প্রতিরোধ কিংবা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে মুছে ফেলা যায় না।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিভাষায় এটিই “means-ends mismatch”-সামরিক উপায় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্যে মৌলিক অসামঞ্জস্য। ইতিহাসে পরাশক্তিদের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কৌশলগত ভুলগুলোর অধিকাংশই এই ফাঁদে পড়ার ফল। ইরানের কৌশল ঠিক বিপরীত দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে। তেহরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রচলিত সামরিক প্রতিযোগিতায় নামেনি। কারণ তারা জানে, শক্তির অসম প্রতিযোগিতায় সরাসরি বিজয় সম্ভব নয়। তাই তাদের লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে সামরিকভাবে ধ্বংস করা নয়; বরং এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে আবদ্ধ করা, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ব্যয় ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।

 

হেনরি কিসিঞ্জারের বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ এখানেই প্রাসঙ্গিক-“The conventional army loses if it does not win. The guerrilla wins if it does not lose.” অর্থাৎ দুর্বল পক্ষের বিজয় অনেক সময় প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং তাকে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন থেকে বিরত রাখার মধ্যেই নিহিত।

 

তবে এখানেই বাস্তবতার আরেকটি দিক রয়েছে। ইরানও কোনো অজেয় রাষ্ট্র নয়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগ সংকট, আর্থিক বিচ্ছিন্নতা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ দেশটির সক্ষমতাকে সীমিত করেছে। ফলে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই ইরানকেও তার মূল্য দিতে হবে। তাই এই সংঘাতকে একতরফাভাবে “কারও বিজয়” বা “কারও পরাজয়” হিসেবে ব্যাখ্যা করা বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।

 

কিন্তু আরও গভীর একটি প্রশ্ন সামনে আসে।

যদি একটি পরাশক্তি তার প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকে আরও অভিযোজিত, আরও আঞ্চলিকভাবে প্রভাবশালী এবং নতুন আন্তর্জাতিক অংশীদার খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে সেই কৌশলকে কতটা সফল বলা যায়?

 

গত দুই দশকের ভূরাজনীতি এই প্রশ্নের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। পশ্চিমা চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইরান চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করেছে। এটি আদর্শিক বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি- এটি স্বার্থভিত্তিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের রাজনীতি। ফলস্বরূপ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু একটি আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।

 

এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও নতুন সংকট তৈরি করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের উত্থান, তাইওয়ান প্রশ্ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা- সবগুলো সংকট একই সময়ে সামাল দেওয়া কোনো পরাশক্তির জন্যই সহজ নয়। আন্তর্জাতিক কৌশলবিদরা একে strategic overstretch বলে অভিহিত করেন-যেখানে সামরিক সক্ষমতা অটুট থাকলেও রাজনৈতিক মনোযোগ, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং কূটনৈতিক শক্তি একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ে।

 

এ ধরনের পরিস্থিতি ইতিহাসে নতুন নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়ন-উভয়ই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে সামরিক শক্তি নয়, বরং অতিরিক্ত কৌশলগত বিস্তারই তাদের দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাস কখনো শুধু যুদ্ধের ফল নয়; যুদ্ধের ব্যয়েরও হিসাব রাখে।

 

এই সংঘাতের অর্থনৈতিক অভিঘাত আরও বিস্তৃত। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, সরবরাহ শৃঙ্খলকে দুর্বল করে এবং পরিবহন থেকে খাদ্য উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায়। যুদ্ধের ধাক্কা সীমান্তে থেমে থাকে না; তা পৌঁছে যায় এশিয়ার শিল্পাঞ্চল, আফ্রিকার খাদ্যবাজার এবং ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার নীতিনির্ধারণে। এই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতকে কেবল দুটি রাষ্ট্রের বিরোধ হিসেবে দেখা ভুল হবে। এটি মূলত একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে একক পরাশক্তির আধিপত্য ধীরে ধীরে বহু-কেন্দ্রিক শক্তির প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে।

 

সবশেষে প্রশ্নটি আবারও রাজনীতির কাছেই ফিরে আসে।

যদি একটি সামরিক অভিযান প্রতিপক্ষের আচরণ মৌলিকভাবে পরিবর্তন করতে না পারে, বরং তাকে আরও সংগঠিত, আরও কৌশলী এবং আরও বিকল্প জোটমুখী করে তোলে, তাহলে সেই অভিযানের সাফল্য কোথায়?

 

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী দশকের বিশ্বরাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে। ইতিহাসের বিচারে পরাশক্তির প্রকৃত শক্তি শুধু যুদ্ধ জয়ের ক্ষমতায় নয়; যুদ্ধ এড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দক্ষতায়। আর অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র প্রায়ই তার সামরিক শক্তি নয়, বরং প্রতিপক্ষকে এমন এক দীর্ঘ সংঘাতে আবদ্ধ করার ক্ষমতা, যার ব্যয় শেষ পর্যন্ত তার কৌশলগত অর্জনকে ছাড়িয়ে যায়।

হয়তো এ কারণেই আজকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি যুদ্ধক্ষেত্রে কে এগিয়ে আছে, সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো-যুদ্ধ শেষ হলে কার কৌশল টিকে থাকবে, কার জোট অটুট থাকবে এবং কার রাজনৈতিক বৈধতা আরও শক্তিশালী হবে। কারণ ইতিহাস বিজয়ীদের নাম মুখস্থ রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে সেই রাষ্ট্রগুলোর কথা, যারা যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থার নিয়ম লিখতে সক্ষম হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
bdit.com.bd