মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও লেবাননের মাটিতে থামছে না ইসরাইলি বাহিনীর রক্তাক্ত আগ্রাসন। চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে নতুন করে একাধিক ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলি বিমানবাহিনী। এতে অন্তত চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। শান্তি আলোচনার মধ্যেই ইসরাইলের এমন উসকানিমূলক হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে তেল আবিবকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে এই মুহূর্তেই হামলা বন্ধ না করলে ইসরাইলকে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ও ভয়াবহ জবাবের মুখোমুখি হতে হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নাজুক যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনা চলার মধ্যেই লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ গভর্নরেটে একাধিক ইসরাইলি হামলা চালানো হয়। লেবাননের জাতীয় বার্তাসংস্থা (এনএনএ) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাইফাদুন এলাকায় দুটি বেসামরিক গাড়ি লক্ষ্য করে পৃথক ড্রোন হামলা চালায় ইসরাইল। একই সময়ে পার্শ্ববর্তী শৌকিন গ্রামেও আরেকটি চলন্ত গাড়িতে নিখুঁতভাবে হামলা চালানো হয়। এই জোড়া ড্রোন হামলায় ঘটনাস্থলেই চারজন প্রাণ হারান এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
প্রকৃতপক্ষে, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘ আলোচনার পুরো সময়জুড়ে ইরানি কর্মকর্তারা বারবার একটি শর্তের ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন; তা হলো—যেকোনো সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরাইলি হামলা অবশ্যই পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। যদিও এই সমঝোতা স্মারকের (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) চূড়ান্ত বিবরণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে এই সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, ওই চুক্তিতে ‘লেবাননসহ সব ফ্রন্টে’ সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের অব্যাহত সামরিক অভিযান ও দখলদারিত্ব সরাসরি আন্তর্জাতিক চুক্তির লঙ্ঘন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ‘এই যুদ্ধে নতুন করে দখল করা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার না হলে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হয়েছে বলা যাবে না।’ একই সঙ্গে ইরানের শীর্ষ যৌথ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স থেকেও ইসরাইলকে চরম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরির সঙ্গে জরুরি টেলিফোনে কথা বলেছেন ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। তিনি লেবাননে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও ঘরবাড়ি ধ্বংস করা বন্ধ করতে এবং দখল করা লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহারে ইসরাইলকে বাধ্য করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। এর আগে অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার ঘোষণা আসার পরপরই ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভোক্তি করে বলেছিলেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের সামরিক দখলদারিত্ব অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে তেহরান আশ্বস্ত করেছে যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে পরবর্তী দফার আলোচনায় তারা লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করবে। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ২ মার্চ পুনরায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে লেবাননে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৩ হাজার ৮২৬ জন নিহত এবং ১১ হাজার ৮৫১ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। শান্তি চুক্তির পর ইসরাইলের এই নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।