অনলাইন রিপোর্টার
হাওরাঞ্চলে কৃষকের একমাত্র ভরসার ফসল বোরো ধান এবার ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওরে পানিতে তলিয়ে গেছে লাখো কৃষকের জমির ধান। এরই মধ্যে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেও ভেজা ও নিম্নমানের ধান না কেনার সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
এবার মৌসুমের শুরু থেকেই হাওরাঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। এপ্রিলের শুরুতে কিছুটা জলাবদ্ধতা থাকলেও পরবর্তী কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে হাওর পুরোপুরি পানিতে তলিয়ে যায়। এর ফলে মাঠে থাকা বোরো ধান প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও কোথাও ধান কেটে খলায় আনা হলেও রোদ না থাকায় সেগুলো শুকাতে পারছেন না কৃষকরা। অনেক জায়গায় ভেজা ধানেই চারা গজিয়ে গেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে।
সরকারি খাদ্য অধিদফতরের উদ্যোগে ৩ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ধান কেনা হচ্ছে। তবে শর্ত অনুযায়ী শুধুমাত্র শুকনো ও মানসম্মত ধানই কেনা হবে, ভেজা বা নিম্নমানের ধান কোনোভাবেই গ্রহণ করা হবে না। এই সিদ্ধান্তে বিপাকে পড়েছেন হাওরের কৃষকরা, কারণ তাদের অধিকাংশ ধানই এখন ভেজা ও অর্ধেক নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।
কিশোরগঞ্জে ১৩টি উপজেলা থেকে মোট ১৮ হাজার ৩৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং পুরো লেনদেন সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে করা হবে। তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, এখন মাঠে বিক্রিযোগ্য শুকনো ধান নেই।
জেলার সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানিয়েছেন, ভেজা ধান কেনা হবে না এবং শুধুমাত্র মানসম্মত ধান সংগ্রহ করা হবে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ধান শুকানোর কোনো সুযোগ নেই। শ্রমিক সংকট ও টানা বৃষ্টির কারণে ফসল ঘরে তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান ইতোমধ্যে পানির নিচে চলে গেছে। এতে অন্তত ৩৬ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কয়েকটি উপজেলায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে, যেখানে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে।
সুনামগঞ্জে এবার প্রায় ২১ হাজার মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। কিন্তু সেখানে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৮০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। হাওরের বহু এলাকায় কৃষকরা কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটার চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে।
নেত্রকোনার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ২২ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩১৩ কোটি টাকার বেশি। এখানে প্রায় ৭০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন, মাঠে থাকা ধান এখন আর বিক্রির উপযোগী নয়, কারণ সবই ভেজা এবং নষ্ট হয়ে গেছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের প্রধান সমস্যা এখন শুকনো ধান না থাকা। তারা বলছেন, সরকার শুকনো ধান ছাড়া কিনছে না, কিন্তু প্রকৃত পরিস্থিতিতে শুকনো ধান পাওয়াই সম্ভব নয়। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে পাইকারদের কাছে ভেজা ধান বিক্রি করছেন, যা তাদের জন্য বড় ধরনের লোকসান ডেকে আনছে।
স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টি ও রোদ না থাকার কারণে ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে কাজ চলছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে বিশেষ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। সরকারের পক্ষ থেকে আগামী কয়েক মাসে বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের কৃষকরা এখন চরম সংকটে পড়েছেন। বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে অনেক পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। শুকনো ধান না থাকায় সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমেও তারা উপকৃত হতে পারছেন না।