সিলেটের রায়নগর রাজবাড়ী এলাকায় স্থানীয় জনপ্রিয় দৈনিক ‘সবুজ সিলেট’ এবং ‘সবুজ সিলেট ভিজ্যুয়াল স্টুডিও’তে দুই দফায় সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রদল নেতা জামিনুল ইসলাম জামির নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী এই তান্ডব চালায়। হামলায় কেবল বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি, বরং জিম্মি করে মারধর করা হয়েছে নিরীহ বাউল শিল্পীদের এবং লুট করা হয়েছে পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম। গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার সূত্রপাত ৩০ এপ্রিল। স্টুডিওতে গান রেকর্ডিং চলাকালে ছাত্রদল নেতা জামিনুল ইসলাম জামির অনুসারী মাহিম ও জিশান স্টুডিওতে প্রবেশ করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যায়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ১ মে রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুনরায় হামলা চালায় ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জামিনুল ইসলাম জামি, রুবেল ও নাজিরের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা স্টুডিওতে ঢুকে দরজা তালাবদ্ধ করে দেয়।
হামলার সময় স্টুডিওতে অবস্থান করছিলেন সিলেট বিভাগের একদল নারী ও পুরুষ বাউল শিল্পী। সন্ত্রাসীরা তাঁদের ওপর চড়াও হয় এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালায়। জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া এক বাউল শিল্পী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা গানের মানুষ, গান গেয়েই আমাদের সংসার চলে। স্টুডিওর ভেতরে আমাদের যেভাবে মারধর করা হয়েছে, তা কল্পনাও করা যায় না। আমাদের বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশ নষ্ট করা মানে আমাদের পেটে লাথি মারা।” কুশিয়ারা মিডিয়া লিমিটেডের সহকারী পরিচালক সাদিকুর রহমান সেলিমকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে জোরপূর্বক ভিডিও ধারণ করা হয়।
স্টুডিওতে তাণ্ডব চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি হামলাকারীরা। তারা ভবনের দ্বিতীয় তলায় দৈনিক ‘সবুজ সিলেট’ পত্রিকা কার্যালয়ে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের কক্ষ তছনছ করা হয়। কর্মরত সাংবাদিকদের খোঁজাখুঁজি করে পুরো এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে সন্ত্রাসীরা। অফিস থেকে হার্ডডিস্ক, পেনড্রাইভ এবং মূল্যবান ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো ঘটনার রোমহর্ষক চিত্র সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধান অভিযুক্ত জামিনুল ইসলাম জামি আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম বুলুর ছেলে হলেও তিনি বর্তমানে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত। রায়নগর ও রাজবাড়ী এলাকায় তিনি একটি বিশাল ‘কিশোর গ্যাং’ নিয়ন্ত্রণ করেন। এই চক্রটি এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মাদক ব্যবসার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন দিনারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী জানিয়েছেন, বিষয়টি তার জানা নেই।
খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শিপলু চৌধুরীর নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মি শিল্পীদের উদ্ধার করে। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাইনুল জাকির বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। পুলিশ গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মো. মনজুরুল আলম জানান, পত্রিকা অফিসের অভিযোগের ভিত্তিতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রের দপ্তরে হামলা ও শিল্পীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর চরম আঘাত। ঘটনার বেশ কয়েক দিন পার হয়ে গেলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় স্থানীয় সংবাদকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। দ্রুত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সিলেটের গণমাধ্যমকর্মীরা ও সুশীল সমাজ।