বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেবল নেতৃত্ববাছাইয়ের প্রক্রিয়া নয়। এই নির্বাচন নতুন প্রজন্মের দিকনির্দেশনার একপ্রতিচ্ছবি। দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্নউচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা— এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পুনরায় ফিরে আসুক সৃজনশীলতা, মতপ্রকাশেরস্বাধীনতা ও সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির চর্চা।
“ডাকসু” বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক প্রতীকী নাম। যাকে শুধুঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ হিসেবে নয়, বরং ‘বাংলাদেশের দ্বিতীয়সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ডাকসু থেকে উঠে এসেছে– ভাষাআন্দোলনের অগ্রদূতরা, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগুনঝরা নেতারাএবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মাইলফলক সৃষ্টিকারীব্যক্তিত্বেরা। স্বাধীনতার সময় এবং পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিকমূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় ডাকসুর ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। এটি ছিল দেশেররাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও ছাত্র রাজনীতির অগ্রযাত্রায় জনমত গঠনের একটিশক্তিশালী মঞ্চ। যা ছাত্র সমাজের স্বপ্ন ও আশার পাথেয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ১৯ বার নির্বাচনের কথা থাকলেও মাত্র ৭ বারই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর ১৯৯১ সালের পর থেকে ডাকসুকার্যত ‘অমাবস্যার চাঁদে’ পরিণত হয়। দীর্ঘ বিরতির মাঝেই ২০১৯ সালেরনির্বাচন এক ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা পড়ে। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রেরউজ্জ্বল দিশারী হিসেবে ডাকসু চিরকাল তরুণ প্রজন্মের কাছে নেতৃত্বেরঅনন্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও ডাকসু একটিনতুন দিগন্তের দিকে ধাবিত হবে। যেখানে ফ্যাসিবাদের বঞ্চনা ও অত্যাচারথেকে মুক্ত হয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকারদেওয়া হবে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে ডাকসু হবে এক কার্যকরী প্ল্যাটফর্ম, যেখানে স্বাধীন চিন্তা, ন্যায়পরায়ণতা ও সমতাবাদী নেতৃত্ব বিকশিত হবে। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা অতীতের কুৎসিত রাজনীতিকে অতিক্রম করেবাস্তব উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিফলনঘটাতে চাইবে। ছাত্ররাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে সহিংসতা কমে গিয়েসমঝোতা, সংলাপ ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্রেরমৌলিক চর্চা প্রতিষ্ঠিত হবে। যা ভবিষ্যতের জাতির পক্ষে এক অনন্যদিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালের পর থেকে ডাকসু নির্বাচনবারবার নানা প্রতিবন্ধকতায় স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। ১৯৯১ সালের ১৮ জুন নির্বাচনের কথা থাকলেও ছাত্রদলের সহিংসতার কারণে তা অনুষ্ঠিতহয়নি। পরবর্তী বছরগুলোয়— ১৯৯৪, ১৯৯৫ এবং ১৯৯৬ সালেউপাচার্যের তফসিল ঘোষণা হলেও ছাত্রলীগের বিরোধিতার কারণেনির্বাচন সম্ভব হয়নি। ১৯৯৮ সালে কমিটি ভাঙার পরেও নির্বাচন কার্যকরহয়নি, যদিও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে সিনেটে প্রস্তাব দিয়েছিল। ২০০৫ সালে আবারো তফসিল ঘোষণা হয়, তবুও ছাত্রলীগের প্রতিরোধে নির্বাচনব্যাহত হয়। এরপর ২০১২ সালে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও কালো পতাকা মিছিলের মাধ্যমে ডাকসু নির্বাচনের দাবি তোলার চেষ্টাকরেন এবং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চ’ গড়ে ওঠে, তবেসেই আন্দোলন তেমন জোরালো হতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে দেখানোহয়েছে ডাকসু নির্বাচনের পথ কতটা প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ।
এবারের নির্বাচনে ভোটার, প্রার্থী এবং প্রশাসনের প্রস্তুতি মিলিয়ে একধরনের গণতান্ত্রিক উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে ক্যাম্পাসজুড়ে। অনেকের মতে, এই নির্বাচন কেবল নেতৃত্বের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরংশিক্ষার্থীদের সামষ্টিক ইচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশের একটি বিরল সুযোগ। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে আবারও শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন নিজেদেরভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ। তবে সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে প্রশাসন এই আস্থার প্রতিফলনঘটাতে পারবে কি না— সেটিই এখন সবার নজরে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের স্মৃতি ও সহানুভূতিকে পুঁজি করে ছাত্রদল মাটিকামড়ে লড়ে যাচ্ছে। আর ছাত্রশিবির বিভিন্ন ছাত্রকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেরমাধ্যমে হলগুলোতে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ছাত্রইউনিয়ন ও বামপন্থি সংগঠনগুলো তাদের নেতাদের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ওঐতিহাসিক ভূমিকার ওপর নির্ভর করছে। একইসঙ্গে, কোটাবিরোধীআন্দোলনের রাজপথ থেকে উঠে আসা বাগছাস (গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ) এবার সরাসরি ভোটের মাঠে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের’ ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবাসিক হলে প্রকাশ্য ও গুপ্তরাজনীতি নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে, যা নিয়ে নানা আলোচনা এবংসন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও প্রক্টর জানিয়েছেন, হল পর্যায়ে রাজনীতিনিয়ন্ত্রিত থাকবে। তবুও কিছু ছাত্র সংগঠন একে নিজেদের স্বার্থ হাসিলেরহাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদের এক নেতা স্বীকার করেছেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের পেছনে অনেকসংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতির তিক্তঅভিজ্ঞতা ও ডাকসু নির্বাচনের তৎপরতা আবাসিক হলগুলোতেসাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রভোস্টরা ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত রাখলেওআসন্ন ৯ সেপ্টেম্বরের ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ছাত্র সংগঠনগুলোকীভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনা করবে তা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ।
ডাকসুকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হলে প্রথমে নির্বাচন প্রক্রিয়াকেসম্পূর্ণ স্বচ্ছ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে হবে। যেখানে প্রশাসন ও বাহ্যিকশক্তির কোনও হস্তক্ষেপ থাকবে না। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকলছাত্রসংগঠনকে সমান সুযোগ ও স্বাধীনতা প্রদান করা জরুরি। যাতেজনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বের বিচার হয় শুধুমাত্র দক্ষতা, আদর্শ ও কার্যক্রমেরওপর। পাশাপাশি ডাকসুর গঠনতন্ত্রে সংস্কার আনা প্রয়োজন। যা সকলপদে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে এবং প্রশাসনেরনিয়ন্ত্রণ কমিয়ে ছাত্রনেতাদের প্রতি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরবে। ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপগ্রহণ এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অপরিহার্য।যাতে ডাকসু হয়ে উঠতে পারে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও অরাজনৈতিকশিক্ষার্থীর সংগঠন।
নতুন প্রজন্ম রাজনীতি বিমুখ নয়। তারা শুধু দখলমুক্ত, অপরাধমুক্ত, চিন্তাশীল ও নীতিনিষ্ঠ ছাত্ররাজনীতি চায়। তাই ডাকসু নির্বাচনে কেবলপেশাদার ছাত্রনেতার বিপরীতে নতুন চিন্তাধারার, একাডেমিকভাবে দক্ষ ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রচারণা, বিতর্ক, প্রতিশ্রুতি ও নির্বাচনী আলোচনাকে হতে হবে গণতান্ত্রিকচর্চার প্রতীক। এ নির্বাচনে যেন শুধু অতীত ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি না হয়।আগামী দিনের জন্য নতুন অধ্যায়ের যেন সূচনা করে। এ নির্বাচনে যদিনতুন প্রজন্ম সচেতনভাবে যুক্ত হয়, প্রশাসন স্বচ্ছতা বজায় রাখে এবংছাত্রসংগঠনগুলো সহনশীল ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্ররাজনীতি চর্চা করে, তবে এই নির্বাচন হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত অর্থে নতুন প্রজন্মেররেফারেন্ডাম। যেখানে নেতৃত্ব দলীয় মনোনয়নে গড়ে উঠবে না। নেতৃত্ব হবেচিন্তা, জনসম্পৃক্ততা ও আদর্শের ভিত্তিতে।
লেখক: কলাম লেখক ও এক্টিভিস্ট