সাইফুল ইসলাম সুজন : ৬ ও ৭ জুলাই ঐতিহাসিকভাবে সিলেটের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হলো এই দুই দিনকে দেশে ত নাই, এমনকি সিলেটেও গুরুত্বের সাথে দেখা হলো না। সিলেটের দুটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা সিলেটের ডাক ও জালালাবাদেও কোন এক কলামের লেখা নেই। স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কোন অনুষ্ঠান হয়েছে বলে গণমাধ্যমেও আসে নি। অথচ, এই দুই দিনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করা দরকার ছিল।
১। ১৭৫৭ সালের পলাশীর পরাজয়ের পরে ১৭৮২ সালের মহররম মাসের ১০ তারিখে ( আশুরার দিনে) যে প্রথম ছোটখাটো বিদ্রোহ হয় কোম্পানীর কালেক্টর রবার্টস লিন্ডসের সাথে, সেই বিদ্রোহ হয় সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে। ওইদিনই শাহি ঈদগাহে টিলার ওপরে জড়ো হয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করেন স্থানীয় শতাধিক লোক। যার নেতৃত্বে ছিলেন নগরের কুমারপাড়া-সংলগ্ন ঝরনার পাড়ের সৈয়দ হাদি (হাদা মিয়া) ও সৈয়দ মাহদি (মাদা মিয়া) নামে দুই ভাই। তারা দুই ভাই শহীদ হন।
২। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই ঐতিহাসিক সিলেট গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। উপনিবেশের শেকল ছেঁড়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য সিলেটের আপামর জনতা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেন। তাদের এই রায় ছিল আত্মপরিচয়ের, ভাষা-সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চেতনার পক্ষে এক গণআন্দোলনের প্রতিফলন।
কিন্তু গণভোটে জয়লাভ করেও করিমগঞ্জ, রতাবাড়ি, বদরপুর, পাথারকান্দি, কুঁয়ারিপুরসহ ৩৪টি থানার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল করিমগঞ্জ কেন ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হলো—এ প্রশ্ন আজও উত্তরবিহীন।
লর্ড র্যাডক্লিফের সেই মানচিত্র বিভাজন ছিল রাজনৈতিক দুরভিসন্ধিমূলক, যেখানে জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে সীমান্তরেখা টানা হয়। স্থানীয়ভাবে এই ঘটনা আজও অনেকের মনে গভীর বেদনার ছাপ ফেলে যায়।
বিভাজনের দায়িত্বপ্রাপ্ত লর্ড র্যাডক্লিফ, ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন এবং কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহরু—এই ত্রয়ীর রাজনৈতিক সমঝোতা এবং চাপে পড়েই সিলেটের পূর্বাংশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল করিমগঞ্জ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ইতিহাসবিদ মো. আবুল কাসেম, সৈয়দ মুস্তাফা আলী ও দিলওয়ার হুসেনের লেখায় দেখা যায়, র্যাডক্লিফ সীমান্তরেখা আঁকেন ১৭ আগস্ট ১৯৪৭-এ, অর্থাৎ স্বাধীনতার ঘোষণার দু’দিন পর। অথচ করিমগঞ্জ গণভোটে জয়ী হয়েও ১৪ আগস্টেই ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট এম এ হক গণভোটের রায়ের আলোকে করিমগঞ্জকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ধরে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি একটানা ৮ দিন পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়ে প্রশাসন চালান, কিন্তু সাহায্যের আবেদন করেও মাউন্টব্যাটেন প্রশাসন বা পাকিস্তানপন্থী কেন্দ্র থেকে তিনি কোনো সহায়তা পাননি।
পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনী করিমগঞ্জে প্রবেশ করে পতাকা নামিয়ে দেয় এবং দখল করে নেয় অঞ্চলটি। এম এ হক-এর অব্যবহিত অপসারণ ও ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ইতিহাসে এক নীরব অথচ তীব্র বেদনার অধ্যায়।
এই ঘটনার পেছনে নিন্মোক্ত জিওপলিটিক্যাল কারণ আছে বলে গবেষকেরা মনে করেন-
১। সিলিগুড়ি করিডোর (চিকেন নেক) রক্ষা ও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য করিমগঞ্জকে রাখা হয় ভারতের নিয়ন্ত্রণে।
২। এই অঞ্চলের রেলপথ, বিশেষ করে করিমগঞ্জ-শিলচর ও আসাম-ত্রিপুরা সংযোগ রুট, ব্রিটিশ ও পরবর্তী কংগ্রেস নেতৃত্বের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
৩। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও করিমগঞ্জের অবস্থান ভারতের ভৌগোলিক প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচিত হয়।