মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দশক ধরে চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও কর্তৃত্বের যুগ শেষের পথে বলে দাবি করেছে মার্কিন সাময়িকী ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা এবং এর ফলাফল মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামোকে বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে।
‘দ্য এন্ড অব আমেরিকাস মিডল ইস্ট’স এরা’ শিরোনামের ওই নিবন্ধের লেখক মার্ক লিঞ্চের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব ধরে রেখেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা আগের অবস্থানে নেই। তার ভাষায়, ইরান বর্তমানে ‘ব্যর্থ একটি ব্যবস্থার শেষ নিঃশ্বাসের’ মুখোমুখি।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের পর মধ্যপ্রাচ্যে যে আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধ সেই ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। এই সংঘাত শুধু ইরান ও তার প্রতিপক্ষদের মধ্যকার শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দেয়নি, বরং অঞ্চলটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কৌশল ও নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মার্ক লিঞ্চের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যর্থতা কয়েক দশক ধরে অনুসরণ করা নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও সহিংসতানির্ভর নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ইরানকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখার পাশাপাশি দেশটির আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারেনি।
নিবন্ধে আরও বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের অন্যতম ভিত্তি ছিল উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি। এ অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও বিপুল সামরিক উপস্থিতির পেছনে এই নিরাপত্তা কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ইরানের হামলা থেকে উপসাগরীয় মিত্রদের কার্যকরভাবে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা সেই নিরাপত্তা-সমঝোতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের ক্ষেত্রে এ পথের কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ফলে এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মার্ক লিঞ্চের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এতদিন যে নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভর করছিল, সাম্প্রতিক সংঘাত সেই কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। ফলে শুধু ইরান নয়, পুরো অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোই এখন নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে বিবেচনা করতে পারে।
‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এর ওই বিশ্লেষণে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব একদিনে শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তবে কয়েক দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত মার্কিন নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক ব্যবস্থার ভিত্তি যে আগের মতো শক্তিশালী নেই, সাম্প্রতিক সংঘাত তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শক্তির ভারসাম্য এবং নতুন ধরনের আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।