অনলাইন রিপোর্টার
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে রাজধানীর ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে দেখা গেছে বাড়িমুখী মানুষের ব্যাপক ভিড়। ভোটগ্রহণের আর ২৪ ঘণ্টাও বাকি নেই— এমন সময় নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটছেন মানুষ। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই স্টেশনের প্রতিটি প্ল্যাটফর্ম, প্রবেশপথ ও টিকিট কাউন্টারের সামনে ছিল উপচে পড়া ভিড়।
সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীচাপ আরও বাড়তে থাকে। আন্তঃনগর এক্সপ্রেস, মেইল ও লোকাল ট্রেন—সব ধরনের ট্রেনেই ছিল অতিরিক্ত ভিড়। কোচের আসনের টিকিট আগেই শেষ হয়ে গেলেও যাত্রীদের ঢল থামেনি। অনেক ট্রেনে ভেতরে দাঁড়ানোরও জায়গা ছিল না। ঝুঁকি জেনেও অতিরিক্ত যাত্রীদের কেউ কেউ ট্রেনের ছাদে উঠে যাত্রা করতে দেখা গেছে।
স্টেশন সূত্রে জানা যায়, টিকিট বিক্রির বড় অংশ অনলাইনে সম্পন্ন হলেও সরাসরি কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ লাইন ছিল। শত শত মানুষ টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। কেউ কেউ স্ট্যান্ডিং টিকিট পেলেও অনেকে সেটিও পাননি। ফলে অনেকে বিকল্প উপায়ে যাত্রার চেষ্টা করেছেন।
প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছিল ভোট উপলক্ষ্যে এক ধরনের উৎসবের আমেজ। কেউ একা, কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই ট্রেনের অপেক্ষায় ছিলেন। ভিড় ও ভোগান্তির মধ্যেও অনেকের চোখেমুখে ছিল আনন্দ ও প্রত্যাশার ছাপ। অনেকের মতে, ভোট শুধু সাংবিধানিক অধিকার নয়— এটি নাগরিক দায়িত্ব ও উৎসবের অংশ।
স্টেশনে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) সক্রিয় ছিল। প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের আগে যাত্রীদের ব্যাগ স্ক্যানিং, টিকিট যাচাই এবং ডিজিটাল স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে স্টেশনে ঢোকানো হচ্ছিল। নিরাপত্তা জোরদার করায় যাত্রীদের প্রবেশে কিছুটা সময় লাগলেও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি।
জামালপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী রাশেদুল হাসান বলেন, তিনি প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন এবং বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত আনন্দের। আগে শুধু ভোটের খবর দেখেছেন, এবার নিজে অংশ নিতে পারছেন— এই অনুভূতিই তাকে উচ্ছ্বসিত করেছে। তিনি আগেভাগেই টিকিট কেটে রেখেছিলেন, যাতে কোনো ঝামেলায় পড়তে না হয়।
রংপুর এক্সপ্রেসের যাত্রী জুবায়ের রহমান জানান, অনেক বছর পর ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তার মতে, ভোট একটি উৎসবের মতো। দীর্ঘদিন ভোট থেকে বঞ্চিত থাকার পর এবার নিজের মত প্রকাশের সুযোগ পাওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট। পরিবর্তন ও দুর্নীতি-অপশাসনের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ছবিতে দেখা যায়, সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস টঙ্গী অতিক্রম করার সময় ইঞ্জিন থেকে শেষ কোচ পর্যন্ত ট্রেনের ছাদে যাত্রী অবস্থান করছেন। একই চিত্র দেখা গেছে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেসেও। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অনেকে ছাদে উঠে যাত্রা করছেন— যা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ব্যবস্থাপক সাজেদুল ইসলাম জানান, গত তিনদিন ধরেই বাড়তি যাত্রীর চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভোট উপলক্ষ্যে টানা ছুটি থাকায় যাত্রীসংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত নজরদারি ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রাজশাহীগামী পদ্মা এক্সপ্রেসের সাপ্তাহিক বন্ধ বাতিল করে গতকাল ও আজ ট্রেনটি চালানো হচ্ছে। আজ বুধবার ঢাকা থেকে ৪৩টি আন্তঃনগর এক্সপ্রেস এবং ২৬টি মেইল ও লোকাল কমিউটার ট্রেন চলাচল করছে। অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচনকে ঘিরে রাজধানী ছাড়ার এই চিত্র শুধু রেলস্টেশনেই সীমাবদ্ধ নয়; বাস টার্মিনাল ও লঞ্চঘাটেও বাড়তি ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। তবে রেলপথে যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনেই চাপ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে বাড়িমুখী মানুষের ঢল রাজধানীর রেলস্টেশনকে এক ভিন্ন চিত্রে রূপ দিয়েছে। নাগরিক দায়িত্ব পালনের আগ্রহ, উৎসবের আমেজ এবং ভ্রমণজনিত ভোগান্তি— সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশ।