তবে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান সংগঠনটির ভেতরে এক ধরনের ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থা তৈরি করেছে। কারণ সংগঠনটির নেতারা একেকজন আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কাউকে বিএনপি, আবার কাউকে জামায়াতের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে। এমনকি হেফাজতের সঙ্গে থাকলেও কোনও কোনও আসনে নিজেরাই নিজেদের প্রধান প্রতিপক্ষ হয়ে লড়াই করেছেন।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—শীর্ষ নেতারা যখন প্রধান দুই রাজনৈতিক মঞ্চে বিভক্ত, তখন কীভাবে চলছে হেফাজতের কার্যক্রম?
ভোটের মাঠে যখন নিজেরাই প্রতিপক্ষ
নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংগঠনের আমির মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী বিভিন্ন মাহফিলে জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ফতোয়া দেন যে জামায়াত মদিনার ইসলামে নয়, বরং ‘মওদুদীবাদে’ বিশ্বাসী, তাই তাদের ভোট দেওয়া ‘হারাম’। অথচ হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ একঝাঁক শীর্ষ নেতা জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক গাঁটছড়া বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
অপরদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের শীর্ষ নেতারা—যারা হেফাজতেরও গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন, আবার বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থেকে নির্বাচনে লড়েছেন। ফলে হেফাজতের একই ব্যানারে থাকা নেতারা নির্বাচনি মাঠে একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন।
রাজনীতিতে কে কোন প্ল্যাটফর্মে?
হেফাজতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই কোনও না কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন। তাদের দলগুলোই আবার প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আলাদা জোটে আছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ নির্বাচনে অংশ নেওয়া জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক একইসঙ্গে হেফাজতে ইসলামের উপদেষ্টা, সহ-সভাপতি মাওলানা জুনাইদ আল হাবিব ও মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব এবং যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মনির হোসেন কাসেমী হেফজতে ইসলামের অর্থ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। বিগত নির্বাচনে জমিয়তে উলামায়ের এই শীর্ষ চার নেতাই বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ নির্বাচন করেছেন। যদিও এই চার আসনে বিএনপি ছাড় দিলেও এদের কেউই জয়লাভ করতে পারেননি।
অপরদিকে জামায়াতের প্ল্যাটফর্মে রয়েছে কওমিভিত্তিক বেশ কয়েকটি দল। তারাও হেফাজতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। গত নির্বাচনে তারা ৩টি আসন লাভ করে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক একইসঙ্গে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব, মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন হেফাজতের সহকারী মহাসচিব, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ হেফাজতের নায়েবে আমির, নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী ও ড. আহমদ আবদুল কাদের হেফাজতের নায়েবে আমির, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী ও মহাসচিব ইউসুফ সাদেক হাক্কানীও হেফাজতের পদে রয়েছেন।
এর বাইরেও জামায়াত জোটে আছেন নেজামে ইসলামী বাংলাদেশের একাংশ। এই দলের শীর্ষ নেতারাও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
এছাড়া মাওলানা আব্দুল কাদির ও মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি এবং অপর অংশের নেতা হাসনাত আমিনী হেফাজতের সঙ্গে থাকলেও বৃহত্তর রাজনৈতিক কোনও প্ল্যাটফর্মে নেই।
স্থবিরতা নাকি স্বাভাবিক গতি? নেতারা যা বলছেন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের এক শীর্ষ নেতা জানান, নির্বাচনের আগে থেকেই সংগঠনের ভেতরে আদর্শিক মতবিরোধ চলছে। অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থে বড় দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় মূল অরাজনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা ‘ঢিমেতালে’ চলছে। ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে বলে তার আশঙ্কা।
তবে এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন সংগঠনের নায়েবে আমির ও খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ধর্মীয় স্বার্থ সংরক্ষণ। রাজনৈতিক কারণে নেতারা ভিন্ন মঞ্চে থাকলেও ইসলামের প্রশ্নে আমরা সবাই এক ব্যানারে আপসহীন। জামায়াত নিয়ে আমিরের বক্তব্য তার ব্যক্তিগত এখতিয়ার। আমাদের ঐক্য রাজনৈতিক, আদর্শিক নয়।” তাদের কোনও কোনও দল বিএনপির সঙ্গেও আছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, “হেফাজত তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে, সেটা বলার সুযোগ নেই।”
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীও একই সুর মিলিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হেফাজত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। নেতারা তাদের রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শ এখানে চাপিয়ে দেন না। আমরা মূলত আমাদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমন্বয় করি। আমিরের ডাকে সবাই এক কাতারেই রাজপথে নামি।” হেফাজতের কাজে কোনও স্থবিরতা নেই, স্বাভাবিক গতিতেই সাংগঠনিক কাজ চলছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ শুরু থেকেই একই চরিত্রে চলছে—রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক আলেমদের সমন্বয়ে। প্রতিষ্ঠাতা আমির আহমদ শফী অরাজনৈতিক হলেও তার পাশে রাজনৈতিক আলেমরা ছিলেন। জুনায়েদ বাবুনগরী অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও তার মহাসচিব মুফতি নূর হোসাইন কাসেমী রাজনীতি করেছেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে আমাদের ভিত্তি। রাজনৈতিক নেতাদের কারণে রাজপথের আন্দোলন আরও সমৃদ্ধ হয়। তাই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে হেফাজত নিষ্ক্রিয়— এটি বলার সুযোগ নেই। গতিহীনতা থাকলে তা অন্য কারণে হতে পারে।”
হেফাজতে ইসলামের উত্থান ও প্রেক্ষাপট
জানা যায়, মূলত ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’র প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম মসজিদ কেন্দ্রিক আন্দোলনে নামে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক কয়েকটি সংগঠন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে আমির ও জুনায়েদ বাবুনগরীকে মহাসচিব করে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’। শুরুতে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে তারা বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক ইস্যুতে সরব হতে থাকে।
সংগঠনটির দেশব্যাপী পরিচিতি ও রাজনৈতিক উত্থান ঘটে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে। ‘নারী নীতি’ বাতিল ও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তাদের ‘নাস্তিক’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিচারসহ ১৩ দফা দাবিতে সেদিন রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ঢাকা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের পুলিশ ও নেতা-কর্মীদের সঙ্গে হেফাজত কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজপথ। ওই ঘটনার পর থেকেই দেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় সংগঠনটি। সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা নিয়ে আজও উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি দাবি করে আসছে।
২০১৩ সালের পর থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হেফাজতে ইসলাম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরবিরোধী আন্দোলন ছিল সংগঠনটির অন্যতম বড় কর্মসূচি। ওই আন্দোলনের জেরে আইনি জটিলতায় পড়ে কারাবরণ করতে হয় সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের অনেক শীর্ষ নেতাকে।
দীর্ঘ দেড় দশকের এই পথচলায় হেফাজত অরাজনৈতিক চরিত্রের দাবি করলেও দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে দলটির প্রভাব চোখে পড়ার মতো।











