ব্যাটারি চালিত রিকশা ও টমটম যেনো সড়কের আরো এক মৃত্যুদানব। নগরীতে বেপরোয়া গতিতে দাপিয়ে বেড়ায়, হালকা এই যানটি। নগরের রাজপথ থেকে অলিগলি। সড়ক থেকে মহাসড়কেও দাপিয়ে বেড়ায় হালকা যান ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক ও সিএনজি অটোরিকশা।
সম্প্রতি নগর এলাকায় প্রশাসন কঠোর হওয়া স্বত্বেও এখনো পুরোপুরি লাগাম টানতে পারেনি। অভিযানের নির্ধারিত সময় শেষে আবারো ‘যেই লাউ, সেই কদু’। এখন অনেকটা চুর-পুলিশ খেলায় মত্ত এসব অবৈধ যানের চালকরা। শহরের আনাচে কানাচে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল অব্যাহত রয়েছে।
সম্প্রতি নগরীতে জেলা প্রশাসন, এসএমপি ও নগর কর্তৃপক্ষের যৌথ অভিযানের এসব যান আটকের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন নগরবাসী। এই অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে আটক করা হচ্ছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা।
গত এক সাপ্তাহের অভিযানে দুই শতাধিক অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা আটক করা হয়েছে। অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল প্রতিরোধে গ্যারেজে চার্জিং পয়েন্টগুলোরও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করতেও অভিযান চলে। এমন কার্যক্রমে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নগরবাসীও।
নগরীর সড়কে অভিযান চালালেও শো-রুমগুলোতে অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিকশা প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে। এগুলো যেন নজর এড়িয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষের। ব্যাটারি চালিত রিকশা কেবল সড়কেই অবৈধ, শো-রুমে বৈধ-এমন প্রশ্ন নগরবাসীর।
সরেজমিন দেখা গেছে, নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সমূহে প্রকাশ্যে ব্যাটারি চালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সিসিক থেকে অনেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছেন পার্টস এবং ব্যাটারির ব্যবসার কথা উল্লেখ করে। বাস্তবে করছেন ঠিক উল্টা সেই ট্রেড লাইসেন্সের কপি দেখিয়ে বেশির ভাগ গ্যারেজ মালিক চার্জিং পয়েন্ট খুলে বসেছেন। শ্যামল সিলেট’র অনুসন্ধানে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।
ট্রেড লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে সহায়তা করে আসছে সিসিকের ট্রেড লাইসেন্স। তাতে সংশ্লিষ্টতা মিলেছে ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা আদায়কারী, পরিদর্শক ও বিদ্যুৎ বিভাগের অঞ্চল ভিত্তিক দায়িত্বশীলরা
(প্রথম পাতার পর)
তারা সরেজমিন প্রতিবেদন না দিয়ে শোরুম মালিকদেরকে ব্যবসার সুযোগ করে দিচ্ছেন। বিদ্যুৎ বিভাগের ক্ষেত্রেও রয়েছে সমান অভিযোগ।
এভাবে অবৈধ শোরুম মালিক ও গ্যারেজে চার্জিং পয়েন্টের মালিকরা নিয়মবহির্ভূতভাবে সংযোগ দিয়েছেন। ফলে বছরের পর বছর অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে চক্রটি। অথচ সিসিকের আদায়কারীর দায়িত্বরতরা কোন অ্যাকশনে যাওয়া বৈকি কোনো আপত্তি করেননি। এ কারণে বছরের পর বছর ধরে কেবল ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তা যেন কিছুতেই দৃষ্টি গোচর হচ্ছেন দায়িত্বরতদের।
অপরদিকে, বেশিরভাগ ব্যাটারিচালিত টমটম ও অটোরিকশার ব্যবসায়ীদের নেই কোন ট্রেড লাইসেন্স। লাইসেন্স এক ধরণের, আর ব্যবসা চলছে আরেক ধরণের। নগরবাসীর অনেকের অভিযোগ, সড়কের অভিযান শুধুমাত্র লোক দেখানো। রিকশা চালকরা সবাই দরিদ্র, তাদের ঘাড়ে আইনের প্রয়োগ না ঘটিয়ে প্রভাবশালী শো-রুম মালিকদের ধরা হচ্ছেনা, ব্যবসার নামে যারা এগুলো সরবরাহ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কেনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। এছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অনেকেই বিভিন্ন শোরুম মালিকদের কাছ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। যে কারণে এসব শোরুম মালিকরা থেকে যাবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
অবশ্য ব্যাটারি চালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে স্থানীয় প্রশাসন। কোন ভাবেই নগরীতে ব্যাটারি চালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশা চলতে দেয়া যাবেনা। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সাথে সংহতি প্রকাশ করে কাজ করে যাচ্ছে
সিসিক। কিন্তু সড়কে ব্যাটারি চালিত অবৈধ রিকশা প্রতিহত করতে পারলেও, শো-রুম বন্ধ করা হচ্ছে না। শো-রুমের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও ব্যাটারি চালিত অবৈধ রিকশার বিরুদ্ধে অভিযান চালালেও অবৈধ টমটমের বিরুদ্ধে এখ নপর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। ব্যাটারি চালিত অবৈধ রিকশা নগরীর সড়ক গুলোতে হ্রাস পেলেও প্রতিটি পয়েন্টে টমটমের দাপট রয়েছে পূর্বের ন্যায়। ফলে অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রশাসক কর্তৃক নগরীতে ব্যাটারি চালিত অবৈধ টমটম ও অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও রহস্যজনক কারনে এসব প্রস্তুত ও বিক্রয়কারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নেয়ায় ক্ষোভে ফুসছেন নগরবাসী। নগরীর প্রতিনিধিত্বশীল একাধিক ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ কালে এসব তথ্য জানা যায়।
সিসিকের ভারপ্রাপ্ত প্যানেল মেয়র ও মহনগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসাল কয়েস লোদী বলেন, পরিকল্পনাবিহীন কোন কর্মই কখনো সুফল বয়ে আনেনা। মূল বিষয়ের প্রতি আমাদের খেয়াল না করে আমরা পার্শ্বিক বিষয় নিয়ে পরে আছি।
ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও টমটম এর উৎপাদন, বিক্রয় ও বিপননকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধুমাত্র চালকদের পিছনে ছুটলে হবেনা। তাই আগে তার মূলউৎপাটন করতে হবে না। প্রথমেই এসবের পিছনে যাদের ইন্ধন রয়েছে, যারা এর থেকে বড় ধরনের সুবিধাভোগী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সবকিছু পশ্রমছাড়া আর কিছুই হবে না।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস্ জার্নালিস্ট কমিশন সিলেট জেলা সভাপতি ফয়সল আহমেদ বাবলু বলেন, প্রশাসন চেষ্টা করছে ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশা ও টমটম বন্ধের জন্য। কিন্তু শুধু সড়কে অভিযান চালালে হবেনা। এর উৎসস্থলেও আঘাত হানতে হবে। আর না হলে দিনশেষে কোন ফলাফল মিলবে না। কেননা একদিকে আপনি সড়কে অভিযান চালাচ্ছেন। অন্যদিকে প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব অবৈধ গাড়ী গুলো অবাধ ব্যবসা অভিযান কে প্রশ্ন বিদ্ধ করে তুলছে। তাই শো-রুম গুলোতে সবার আগে অভিযান চালাতে হবে।
সিলেট বিভাগ কল্যাণ সংস্থার সভাপতি এহসানুল হক তাহের বলেন, সড়কে অভিযান আর শো-রুমেনিরব এটি এক ধরনের প্রতারণা। যা সড়কে অবৈধ, তা সকল ক্ষেত্রেও অবৈধ। তাই সবার বিরুদ্ধে সমান ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমনকি ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন আর টমটমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন না তা হবে না।
এসএমপি পুলিশ কমিশনার মো. আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ টমটম ও রিকশার শোরুম ব্যবসায়ীদে বিরুদ্বে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শীঘ্রই ফলাফল দেখতে পাবেন।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাই রাফিন সরকার বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ টমটম ও রিকশার শোরুম ব্যবসায়ী ও গ্যারেজে যারা চার্জিং পয়েন্ট তৈরি করেছে। আমরা সরেজমিন তালিকা তৈরি করেছি। কে কোন ধরণের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে এবং তার অপব্যবহার করছে সেই তালিকা ও ছবি আমরা প্রস্তুত করেছি।
রাজস্বশাখার ও প্রচলিত আইন মোতাবেক জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুতই আমরা অভিযান পরিচালনা করবো। এসব ট্রেড লাইসেন্স প্রদাণের কর্মকর্তা কর্মচারী কারও কোন অনৈতিক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মোটকথা ব্যাটারিচালিত অবৈধ যানবাহন যাই হোক তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে যেহেতু তাদের আইনগত কোন ভিত্তি নেই।
সিন্ডিকেটে সয়লাব ব্যাটারি চালিত রিকশা ও টমটম: সিলেট নগরীতে রয়েছে প্রায় শতাধিকের বেশি প্রতিষ্ঠান। যারা সরাসরি ব্যাটারি চালিত অবৈধ রিকশা ও টমটম ব্যবসার জড়িত। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের চার্জিং স্টেশন ব্যবসার সাথে জড়িত, কেউ গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছে। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান সরাসরি এগুলো তৈরি ও বাজারজাতের সাথে জড়িত রয়েছে। তবে একাধিক প্রতিষ্ঠান সিলেটের বাহিরে থেকে আমদানি করছে বলে জানা গেছে।
নগরীর ৪,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডে ৬ টি প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি চালিত অবৈধ অটোরিকশা ও টমটম ব্যবসার জড়িত। চার্জিং স্টেশন-২টি গেরেজ-৪টি শো-রুম ও মেরামতকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে-২টি সিসিকের তথ্য অনুসারে তাদের কারো কাছে ব্যবসার অনুমতি পত্র নেই।
নগরীর ৭ নং ওয়ার্ডে ৬টি প্রতিষ্ঠান ব্যাটারি চালিত অবৈধ অটোরিকশা ও টমটম ব্যবসার জড়িত। জনতা ট্রেডার্স এবং ফাহিমা রিক্সা ছাড়া আর কারও কাছে ব্যবসার অনুমতি পত্র নেই। ১টি চার্জিং স্টেশন ছাড়া বাকিগুলো গ্যারেজের ব্যবসায় জড়িত। নগরীর ৯ নং ওয়ার্ডে শো-রুমও গ্যারেজ সহ ৭টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসার সাথে জড়িত। জামান অটো পার্টস এবং তাব্বি অটো ছাড়া আর কারও ব্যবসার অনুমতি পত্র নেই। নগরীর ১০ নং ওয়ার্ডে প্রায় ২০ টি বেশি প্রতিষ্ঠান গ্যারেজ ব্যবসার সাথে জড়িত। যাদেও কারও ব্যবসার অনুমতি পত্র নেই।
নগরীর ১২ নং ওয়ার্ডে ৩টি প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পাওয়া যায়। জনতা এন্টার প্রাইজের পক্ষ থেকে সিসিক থেকে যদিও পার্টসের ব্যবসার অনুমতি নেয়া হয়েছে। বাস্তবে তারা অবৈধ রিকশা ও টমটমের ব্যবসা পরিচালনা করছে। অপর ২টির ১ গ্যারেজ ও ১ চার্জিং পয়েন্ট হিসেবে রয়েছে।
নগরীর ১৩ নং ওয়ার্ডে রয়েছে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠান। এরমধ্যে মেসার্স আমিনা ট্রেডার্স নামে ২টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাটারি ও মেরামতের জন্য এবং সাফান্টার প্রাইজেরও ১টি প্রতিষ্ঠানের ব্যাটারি ও মেরামতের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। বাকি ৮ প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নেই। তবে সবাই অবৈধ ব্যাটারি চালিত টমটম ও রিকশার শো-রুম।
নগরীর ১৭নং ওয়ার্ডে রয়েছে ৪টি প্রতিষ্ঠান যারা রিকশা গ্যারেজের ট্রেড লাইসেন্স নিয়েছে। বাস্তবে ব্যাটারি চালিত রিকশার ব্যবসায় জড়িত। অপর দিকে ১৮ ও ১৯ নং ওয়ার্ডে ৪টি ২১ নং ওয়ার্ডে ৩টি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে। ২৪ ও ২৫ নং ওয়ার্ডে রয়েছে আরো ১১ টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট।
২৬ ও ২৭ নং ওয়ার্ডে শো-রুমসহ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ৭টি গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। নগরীর ২৯ নং ওয়ার্ডে ৫টি, ৩০ নং ওয়ার্ডে ৬টি, ৩২ ও ৩৩ নং ওয়ার্ডে ১০টি এবং ৩৪ ও ৩৫ নং ওয়ার্ডের ১০ সহ উল্লেখিত ওয়ার্ড সমূহে শো-রুম, চার্জিং পয়েন্টও অধিক গ্যারেজ রয়েছে।