কোথাও ইটের গাঁথুনিতে ফাটল। কোথাও খসে পড়ছে পুরোনো দেয়ালের অংশ। দরজা-জানালা ও লোহার বিভিন্ন অংশে ধরেছে মরিচা। ইস্পাতের অ্যাঙ্গেলও ক্ষয়ে যাচ্ছে। কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের পুরোনো স্থাপনাগুলোর দিকে তাকালে সময়ের দীর্ঘ ছাপ চোখে পড়ে। পাকা প্ল্যাটফর্মের কোথাও কোথাও দেখা দিয়েছে ফাটল। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এসব স্থাপনা এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত।
অথচ একসময় এই জংশন ছিল ব্যস্ত রেল যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করত ‘লাতু ট্রেন’। এই রেলপথ দিয়ে চা, পাট ও কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি যাতায়াত করতেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ থাকায় কুলাউড়া হয়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগকেন্দ্র।
সময়ের ব্যবধানে সেই ব্যস্ততার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। ভারতের সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে। ২০০৫ সালে বন্ধ হয়েছে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল যোগাযোগও। আর এর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ কমেছে জংশনের পুরোনো স্থাপনাগুলোর। এখন সেগুলোর অনেকটাই পড়ে আছে অবহেলায়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ইতিহাসসচেতন ব্যক্তিদের অভিযোগ, কুলাউড়া জংশনের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেই। একসময়কার রেল যোগাযোগ, বাণিজ্য ও জনজীবনের স্মৃতি বহন করা এসব স্থাপনা ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে অবকাঠামো, কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো নির্মাণের চিহ্ন।
কুলাউড়া জংশন স্টেশনের পাশের জয়পাশা এলাকার বাসিন্দা রাসেল আহমদ বলেন, ‘কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন শুধু একটি রেলস্টেশন নয়, এটি বৃহত্তর সিলেটের রেল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ব্রিটিশ আমলের এসব স্থাপনার সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের বহু বছরের স্মৃতি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে স্থাপনাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখনই এগুলো সংরক্ষণে উদ্যোগ না নিলে একসময় গুরুত্বপূর্ণ এই ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো হারিয়ে যাবে।’
কুলাউড়া জংশনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনামলের রেল যোগাযোগ বিস্তারের সঙ্গে জড়িয়ে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৮৯৬ থেকে ১৮৯৮ সালের মধ্যে কুলাউড়া হয়ে আখাউড়া-বদরপুর রেলপথ চালু হয়। এরপর ১৯১২ সালের ১৬ এপ্রিল কুলাউড়া থেকে কুশিয়ারা ঘাট পর্যন্ত একটি শাখা রেলপথ চালু হলে কুলাউড়া পূর্ণাঙ্গ জংশনের মর্যাদা পায়। ১৯১২ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে চালু হয় কুলাউড়া-সিলেট রেলপথও।
রেল যোগাযোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে থাকে কুলাউড়ার গুরুত্ব। বিভিন্ন দিক থেকে রেল এসে মিলত এই জংশনে। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি যাত্রীদের আনাগোনায় স্টেশন এলাকা হয়ে ওঠে ব্যস্ত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় এই জংশনকে ঘিরে তৈরি হয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড।
সেই সময়ের স্টেশন এলাকার চিত্রও ছিল আলাদা। কুলাউড়া জংশনে ছিল রিফ্রেশমেন্ট রুম, পানশালা এবং হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য আলাদা হোটেল। রেলপথ শুধু মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেয়নি, কুলাউড়ার সঙ্গে আশপাশের অঞ্চল ও ভারতের বিভিন্ন এলাকার বাণিজ্যিক যোগাযোগও তৈরি করেছিল।
‘লাতু ট্রেন’ ছিল সেই যোগাযোগের একটি পরিচিত অংশ। কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর হয়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলাচল করা এই ট্রেনের সঙ্গে যুক্ত ছিল মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের দীর্ঘ ইতিহাস।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সঙ্গে সরাসরি এই রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাতে কুলাউড়া জংশনের আগের সেই আন্তসীমান্ত যোগাযোগ আর থাকেনি। এরপর ২০০৫ সালে কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেল যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্থাপনাগুলোর ব্যবহারও কমে যায়। রক্ষণাবেক্ষণ কমতে কমতে একসময় সেগুলোর অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এখন পুরোনো ভবনের ইটের গাঁথুনি, দরজা-জানালা, লোহার অংশ ও ইস্পাতের অ্যাঙ্গেল ক্ষয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে এসব স্থাপনা শুধু জরাজীর্ণই হবে না, একসময় হয়তো অস্তিত্বও হারাবে।
কুলাউড়া শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সম্পাদক প্রভাষক সিপার উদ্দিন আহমদ বলেন, কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন বৃহত্তর সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্নে এটি হারিয়ে যেতে বসেছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনের সিনিয়র স্টেশন মাস্টার রুমান আহমদ বলেন, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এসব স্থাপনা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। পুরোনো কিছু স্থাপনা ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আপত্তির কারণে সেগুলো ভাঙা হয়নি।
এই তথ্যটি কুলাউড়া জংশনের পুরোনো স্থাপনাগুলো নিয়ে প্রশ্নটিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। কারণ, একদিকে এগুলো ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, অন্যদিকে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ বা সংরক্ষণের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, যেসব স্থাপনার সঙ্গে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের রেল যোগাযোগ ও বাণিজ্যের ইতিহাস জড়িয়ে আছে, সেগুলো সংরক্ষণের দায়িত্ব কার? আর সংরক্ষণ না করে এগুলোকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখলে শেষ পর্যন্ত কী থাকবে সেই ইতিহাসের?
এ ব্যাপারে সিলেট সেকশনের সহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ বলেন, কুলাউড়া জংশনের পুরোনো স্থাপনাগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণে স্থানীয় সচেতন মহল এগিয়ে এলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ বিষয়ে উদ্যোগ নেবে।