দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ছিলেন বিএনপির মহাসচিব, আজ থেকে তাঁর নামের পাশে যুক্ত হবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি।
প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে ক্ষমতাসীন দল মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তৃণমূল থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসতে বিএনপির কঠিন সময়ে দলকে নেতৃত্ব দেয়া এবং ‘ক্লিন ইমেজে’র রাজনীতিক বলে পরিচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ এক পথ।ছাত্রজীবনে ছাত্র রাজনীতি, সেখান থেকে শিক্ষকতা, সে পেশা ছেড়ে ফের রাজনীতির মাঠ। রাজনীতিতে নেমেই নির্বাচিত হয়েছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান।
খালেদা জিয়া কারাবন্দী ও তারেক রহমানের নির্বাসিত অবস্থায় মামলা-নির্যাতনে যখন বিএনপি অনেকটা টালমাটাল অবস্থায় ছিল তখন দেশের ভেতর দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দলের রাজনীতিতে তার দায়িত্বশীল ভূমিকা আর পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বই তাকে রাষ্ট্রপতির পদের জন্য যোগ্য করে তুলেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, খালেদা জিয়ার যখন কারা অন্তরীণ, রাজনীতিতে বেশ টালমাটাল অবস্থায় বিএনপি, তখন মির্জা ফখরুলের দৃঢ় অবস্থান আমরা দেখেছি। বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন, তারপরও তিনি মাটি কামড়ে পড়েছিলেন।
শিক্ষকতা পেশা থেকে রাজনীতির মাঠ :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬০ এর দশকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন তিনি। তাকে সে সময় কারাগারেও যেতে হয়েছিল।
শিক্ষা জীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক পদে যোগ দেন। এরপর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষকতা করেন তিনি।
পরে তিনি ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে সে সময়ের উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর পিএস পদে যোগ দেন।
কয়েক বছর পর ১৯৮৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বা ন্যাপে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন মির্জা ফখরুল। দুই বছরের মাথায় ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন তিনি।
এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ১৯৯০ সালে তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি এবং পরে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হন।
১৯৯১ সালে তিনি বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচন করেন। তবে সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার জয়ের দেখা পান নি তিনি। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ওই বছরই চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় মির্জা ফখরুল প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
এরপর মন্ত্রীসভায় পরিবর্তন আনা হলে তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান এবং ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওই পদেই বহাল ছিলেন।
রাজনীতির কঠিন সময়ের নেতৃত্ব :
২০০৬ সাল থেকে ২০২৪ সাল – এ সময়কালে রাজনীতিতে কঠিন একটা সময় পার করেছে বিএনপি।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব আটক ও কারাবরণ, কখনো দল ভাঙনের মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রায় পুরোটা সময় বিএনপি রাজনীতিতে অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থানে ছিল। চ্যালেঞ্জিং সেই সময়ে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মির্জা ফখরুল।
সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয় বিএনপির। সে নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে দলীয় মনোনয়ন পেলেও জিততে পারেননি তিনি। এরপর ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল।
মাত্র দুই বছরের মাথায় ২০১১ সালে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যান। তার মৃত্যুর পর মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন খালেদা জিয়া। ওই বছরই আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের প্রতিবাদে ২০১৪ সালের পাঁচই জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। আন্দোলনে নামে বিএনপি। বিএনপির সিনিয়র নেতৃত্ব গ্রেফতার, মামলা ও দমন-পীড়নের মুখে পড়ে।
এর প্রায় দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৩০শে মার্চ বিএনপির পুর্নাঙ্গ মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল।